তাতারদের আদ্যোপান্ত
তাতারদের ইতিহাসে আমাদের জন্য বহু শিক্ষা রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ইতিহাস পাঠের গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই তাদের কাহিনীতে জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ রয়েছে’ (ইউসূফ ১২/১১১)। তিনি আরো বলেন, ‘অতএব এদের কাহিনী বর্ণনা কর যাতে তারা চিন্তা করে’ (আ‘রাফ ৭/১৭৬)। পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষ যত ধ্বংসলীলা চালিয়েছে তার সব কিছুকে ছাড়িয়ে যাবে তাতারদের ধ্বংসযজ্ঞ। বাগদাদ ধ্বংসকে কেন্দ্র করে বহু কবি কবিতা রচনা করেছেন। কেউবা গেয়েছেন শোকগাঁথা। অনেক ঐতিহাসিক লিখেছেন ইতিহাস গ্রন্থ। কিন্তু এর ভয়াবহতা বর্ণনা করে কেউ পরিসমাপ্তি টানতে পারেননি। বাদশাহ বখতে নছর বায়তুল মাকদাস ধ্বংস ও তার অধিবাসী বনু ইসরাঈলদের হত্যা করেছিলেন। কিন্তু বাগদাদ ধ্বংসের সাথে তার তুলনা হবে না। দাজ্জাল পৃথিবীতে এসে মানুষ হত্যা করবে। কিন্তু তার অনুসারীদের রেহাই দিবে। পক্ষান্তরে তাতার এমন এক রক্তপিপাসু জাতি ছিল, যারা নারী-পুরুষ ও শিশু সবাইকে হত্যা করেছে। এমনকি গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত ঘটিয়ে ভ্রূণকেও হত্যা করেছে। বিশ্ব হয়তো ইয়াজূজ-মাজূজ ব্যতীত কারো দ্বারা এরূপ হত্যাকান্ড কখনো দেখেনি এবং ভবিষ্যতেও দেখবে না।
অনেক ঐতিহাসিক তাদের ধ্বংসযজ্ঞকে ইয়াজূজ-মাজূজের ধ্বংসলীলার সাথে তুলনা করেছেন। তারা ছিল সূর্যের পূজারী। তারা কুকুর-শূকরসহ সকল প্রাণীর গোশত খেত। তাদের বৈবাহিক কোন ভিত্তি ছিল না। ফলে নারী-পুরুষ যে যাকে ইচ্ছা ভোগ করত। সন্তানদের কোন পরিচয় ছিল না। এ কারণে হয়তো তারা এত হিংস্র ছিল। তাদের নারী সৈন্যরাও শত শত মানুষকে হত্যা করত। তাদের যুদ্ধ কৌশল দেখে লোকেরা তাদেরকে পুরুষ মনে করত। তাতারদের অপকর্মের বর্ণনা দিয়ে ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, একদা আমি তাতারদের শাসন আমলে কতিপয় সাথীসহ তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন তারা মদ পান করছিল। আমার সঙ্গী-সাথীরা তাদেরকে তিরস্কার করল। আমি সাথীদের ধমক দিয়ে বললাম, আল্লাহ তো এজন্য মদ হারাম করেছেন যে, এটি আল্লাহর যিকির ও ছালাত আদায়ে বাধা দেয়। আর মদ এ সকল লোককে মানব হত্যা, সন্তানদের বন্দি ও সম্পদ লুণ্ঠন থেকে বিরত রেখেছে। এই তাতাররা পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাদের অনেকে ইসলামের খিদমতে নিজেদের নিয়োজিত করে।
তাতারদের পরিচয়:
তাতার ও মোগল বলতে ঐ সকল সম্প্রদায়কে বুঝায় যারা উত্তর চীনের জূবী হীম-শিতল মরু এলাকায় বসবাস করত। মোগল আসলে তাতারদের একটি শাখা গোত্র। অনুরূপ তুরকী, সুলজূকী ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠী তাতারদেরই অংশ। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতেন চেঙ্গীস খান। তারা মোগল নামেই পরিচিতি লাভ করেছিল। এদের রাজত্ব এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তারা পূর্বে কোরিয়া থেকে পশ্চিমে ইসলামী রাজ্য খাওয়ারিযম এবং উত্তরে সাইবেরিয়া থেকে দক্ষিণে চীন সাগর প্রর্যন্ত তাদের রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হয়। যা বর্তমানে চীন, মোঙ্গলিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও সাইবেরিয়ার কিছু অংশ থেকে লাউস, মায়ানমার, নেপাল ও ভুটানকে শামিল করে।
সপ্তম হিজরী শতকে মোগলদের যে বিজয় বন্যা চলছিল তাতে তারা ‘তাতার’ নামে পরিচিত ছিল। চীন, ইসলামী ভূখন্ড বা ইউরোপে অথবা রাশিয়া সর্বত্র তাতাররা পরিচিত ছিল। এজন্য ইবনুল আছীর (রহঃ) চেঙ্গীস খানের পূর্ব পুরুষদের তাতার বলে অভিহিত করেছেন। অপরদিকে প্রাচীন জাপানীরা তাদেরকে সাকীছিয়া (Sacythia) বা সাকীতিয়া নামে চিনত।
আল্লামা আলী মুহাম্মাদ আছ-ছাল্লাবী (১৯৬৩) বলেন, পশ্চিমে ইউরোপ মহাদেশ, পূর্বে জাপান ও প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত এবং উত্তরে সাইবেরিয়া ও বাল্টিক সাগর, দক্ষিণে আরব উপদ্বীপ, সিরিয়া ও ফিলিস্তীন পর্যন্ত তাতারদের রাজত্ব বিস্তার লাভ করে। তিনি আরো বলেন, হিজরী দ্বিতীয় শতকে তাতাররা প্রধানতঃ দু’টি দলে বিভক্ত ছিল। যাদের একটিতে নয়টি কাবীলা ছিল। আর অপরটিতে ত্রিশটি কাবীলা ছিল বা গোত্র ।
হিজরী চারশ’ শতকের পূর্বে (১০০০ খৃঃ) ইতিহাসের পাতায় মোগল নামের অস্তিত্ব ছিল না। গ্রহণযোগ্য মতের ভিত্তিতে বলা যায় যে, এ গোত্রসমূহ তাতারদের কোন এক নেতার নেতৃত্বে একীভূত হয়, যে ঐ নামের পরিচয় বহন করছিল। অতঃপর ঐ নেতা তার রাজত্ব চুক্তিবদ্ধ সকল গোত্রের উপর বিস্তার করে এবং এভাবে মোগল নামটি পরিচিত হয়ে উঠে। এরপর একদল যোদ্ধা তাদেরকে ছেড়ে এশিয়া মায়নরে চলে যায়। যাদের পরবর্তীরাই তুর্কী তাতার বা কারা’তাতার নামে পরিচিতি লাভ করে। তারা তায়মুর লঙের হামলার সময় আমাসীয়া ও কায়ছারিয়ার মধ্যে অবস্থিত গ্রাম-গঞ্জে যাযাবরী জীবন-যাপন শুরু করে। এ সময় সংখ্যায় তারা প্রায় তিন হাযার থেকে চার হাযারটি পরিবার ছিল। পরে তায়মুর লঙ তাদেরকে মধ্য এশিয়ায় বিতাড়িত করেন। উছমানীয় শাসক দ্বিতীয় বায়েযীদ তাদেরকে কাশগর ও খাওয়ারিযমে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। তায়মূর লঙের মৃত্যুর পরে এই তুর্কী তাতাররা পুনরায় এশিয়া মায়নরে ফিরে আসে এবং নতুনভাবে বসতী স্থাপন করে। এজন্য রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে বসবাসরত তাতার বলতে সকল তুর্কী জনগোষ্ঠীকে বুঝায়।
কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন তাতাররা তুর্কীদেরই একটি বড় জনগোষ্ঠী। অন্যান্য গোত্র তাতারদের শাখা। ফলে তারা পুরো তুর্কী জাতিকে তাতার হিসাবে গণ্য করেন। অতএব মোগলরা তাতারদেরই একটি অংশ। বিশেষতঃ মানকূস (Manchos) জাতি। যেমনটি বর্তমানে চীনে তাদের অবস্থান। তুর্কী ঐতিহাসিকগণ বলেন, পূর্বযুগে আলান্জা খান নামে তাতারদের একজন বাদশাহ ছিলেন। তাতারখান ও মোগল খান নামে তার দু’জন সন্তান ছিল। যেমনটি আরবে মুযার ও রাবী‘আ দু’জন ব্যক্তির নামে দু’টি গোত্র পরিচিতি লাভ করে। এভাবে তাদের জীবন ইতিহাস চলতে থাকে। এক পর্যায়ে মোগল সম্রাট ইলাখান ও তাতার সম্রাট সুনজু খানের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে রূপ নিলে তাতার সম্রাট সুনজু খান বিজয় লাভ করেন। মোগলরা পরাজিত হয়। এতে পুরো ক্ষমতা চলে আসে তাতারদের হাতে। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যায়নি। যুগের পর যুগ ধরে যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। অবশেষে চেঙ্গীস খানের পিতা ইয়াসুকী বাহাদুর খান ক্ষমতা লাভ করেন।
তাতারদের ধর্মীয় পরিচয়:
তাতাররা সম্রা্ট আকবরের দ্বীনে এলাহীর ন্যায় এক বিস্ময়কর ধর্মের অনুসরণ করত। এটি বিভিন্ন ধর্মের সমন্বিত ধর্ম ছিল। চেঙ্গীস খান ইসলামী শরী‘আত, খ্রিষ্টীয় শরী‘আত ও বৌদ্ধ ধর্মের কিছু নিয়ম নীতির সমন্বয় ঘটিয়ে তাতারদের জন্য নতুন এক ধর্মের প্রবর্তন করেন, যার নাম ছিল ‘আল-ইয়াসাক্ব’। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, তাতারদের কেউ ইহুদী কেউবা খৃষ্টান আবার কেউ সবগুলো মেনে চলত। তাদের কেউ আবার মূর্তিপূজার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করার চেষ্টা করত। মোটকথা চেঙ্গীস পুত্রদের এই নীতি ছিল যে, যার যে ধর্ম পসন্দ সে তা গ্রহণ করতে পারবে। অন্যরা সেটিকে অবজ্ঞা করবে না।
ইসলাম পূর্ব তাতাররা তারকা পূজা করত। সূর্য উদয়ের সময় তাকে সিজদা করত। কোন কিছুকে হারাম মনে করত না। তারা সকল প্রাণীর গোশত ভক্ষণ করত। এমনকি কুকুর-শূকরের গোশত ভক্ষণ করতেও কুণ্ঠিত হ’ত না। তাদের কোন পিতৃ পরিচয় ছিল না। মোগল-তাতারদের শামানিয়া (Shamaniasm) নামে এক পুরাতন ধর্ম ছিল। তারা বহু ক্ষমতাধর ইলাহে বিশ্বাসী ছিল। তাদের ছালাত আদায় করা লাগত না। পারস্পরিক কোন ভালোবাসা ছিল না। তারা ঐ সকল নিকৃষ্ট প্রাণীরও ইবাদত করত যেগুলোকে তারা তাদের মহাক্ষমতাধর ইলাহের জন্য উৎসর্গ করত। তারা বিশ্বাস করত যে, এগুলো বিপদের সময় তাদেরকে সাহায্য করবে। অনুরূপভাবে তারা তাদের মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মারও দাসত্ব করত।
হাফেয ইবনু কাছীর, ইবনুল আছীর প্রমুখ
ঐতিহাসিকগণ তাদের ধর্ম সম্পর্কে বলেন,
‘আর তাদের ধর্মকর্ম ছিল যে, তারা সূর্য উদয়ের সময় তাকে সিজদা করত। তারা কোন কিছুই হারাম মনে করত না। তারা সকল প্রাণীকে ভক্ষণ করত। এমনকি কুকুর, শূকর ইত্যাদি প্রাণীর গোশতও খেত। বিবাহের সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান ছিল না। বরং একজন নারীর কাছে বহু পুরুষের গমনাগমন হ’ত। ফলে সন্তান জন্মিলে পিতৃ পরিচয় মিলত না।
তাতারদের বিস্তারকালে সমসাময়িক অবস্থা:
হিজরী ষষ্ঠ শতকের শেষের (১২০০ খৃষ্টাব্দ) দিকে তাতারদের আবির্ভাব ঘটে এবং একশ’ বছরের মধ্যে তাদের ধ্বংসলীলা ও রাজ্য জয়ের কারণে ব্যাপক পরিচিতি ঘটে। হিজরী চতুর্থ শতকে চিনের ক্ষমতায় ছিল তান্জ। অতঃপর সমগ্র চীনকে দশটি ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। এরপর চীনের ক্ষমতায় চলে আসেন তাতার নেতা ‘সুন্জ’। যিনি গোটা চীনকে একীভূত করতে সক্ষম হন। তার রাজত্ব চলে ৯৬০ খৃষ্টাব্দ থেকে ১১২৭ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত। এ সময় দীর্ঘকাল থেকে চলে আসা নিয়ম-নীতির পরিবর্তন হয়। ক্ষমতা চলে যায় রাজাদের হাতে। উত্তর চীনের ক্ষমতায় আসীন হন রাজা কীন। এতে সুন্জু পরিবারের ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে দক্ষিণে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এজন্য ১১২৭ খৃষ্টাব্দ থেকে ১২৯০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সুন্জু পরিবারের শাসনকে ‘মামলাকাতু সুনজিল জুনবিয়া’ বলা হয়ে থাকে। আর ৭ম হিজরী শতকের প্রারম্ভে ভারতবর্ষে ক্ষমতায় আসীন হন রাজা খাওয়ারিযম শাহ। কুতুবুদ্দীন আইবেক ৬০৩ হিজরী সনে ভারত জয় করেন। যদিও তিনি একজন গোলাম ছিলেন। এরপর তিনি দিল্লীতে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলমানেরা ভারতে ক্ষমতায় আসলেও বহু দিন থেকে চলে আসা বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের তেমন কাছে টানতে পারেনি।
হিজরী সপ্তম শতকের শুরুতে মুসলিম শাসিত রাজ্যসমূহের অবস্থা:
এ সময় ইসলমী সম্রাজ্য বিভিন্ন ছোট ছোট দেশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আর এর নেতারা অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই শাসকেরা খাওয়ারিযম রাজ্যর উপর ভয়ংকর মোগল সৈন্যদের হামালার পূর্বে তাদের রনকৌশল ও সমর দক্ষতা সম্পর্কে জানতে পারেননি। এদিকে রাজ্য জয়ে মোঙ্গল তাতারদের হামলা অব্যাহত থাকে। পরে চীন ও তুরকিস্তান এবং ভারত, ইরান, এশিয়া মায়নর ও পূর্ব ইউরোপের কিছু অংশ তারা দখল করে নেয়। এরপরেও দ্বন্দ্বে লিপ্ত মুসলিম শাসকেরা নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করার চিন্তা করেনি। যাতে তারা সর্বধ্বংসী মোগলীয় যুদ্ধ স্রোতকে প্রবল হওয়ার পূর্বে বাধা দিতে পারে। স্বয়ং বাগদাদে ক্ষমতা লোভী নেতারা স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। শী‘আ-সুন্নী দ্বন্দ্ব বিপদজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। দজলা নদীর প্লাবন অত্যন্ত ভয়ংকর হয়ে পড়েছিল। নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল এবং অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ইরাকের অর্ধভূমি ধ্বংসে নিপতিত হয়েছিল। আরো বলা যায় যে, আববাসীয় শাসনের দ্বিতীয় যুগের শুরু থেকেই রাষ্ট্রের নিয়ম-শৃংখলা ভেঙ্গে পড়ে। ইরাকের দক্ষিণ অঞ্চলের বহু এলাকা জলাভূমিতে পরিণত হয়। অথচ ইতিপূর্বে এই ভূমি ছিল আববাসীয় সম্রাজ্যের প্রাচুর্যের ভিত্তি এবং সভ্যতার ধারক। যেমন প্রথম দিকে প্রাচ্যের খাওয়ারিযমের বাদশাহগণ নিজেদের সৈন্যদেরকে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব দিকে আববাসীয় খিলাফত রক্ষার কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন। কিন্তু পরে আলাউদ্দীন মুহাম্মাদ খাওয়ারিযমশাহ বাগদাদ দখলে নেওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। যেমনটি ইতিপূর্বে বনু বুওয়াইহ ও সুলজুকীরা করেছিল। কিন্তু তিনি দু’টি কারণে তার ইচ্ছা পূরণে ব্যর্থ হন। প্রথমতঃ প্রবল তুষার ঘূর্ণীঝড়ের কারণে ফিরে যেতে বাধ্য হন। দ্বিতীয়তঃ মোগল সৈন্যরা তার রাজ্যের উপর প্রচন্ড হামলা করে। অবশেষে তিনি কাযবীন সাগরে পলায়নে বাধ্য হন এবং কোন এক দ্বীপে ৬২০ হিজরী সনে মারা যান। এই আধিপত্য বিস্তারের লড়াই ও প্রবল যুদ্ধের পর মোগলরা তাদের দেশে ফিরে আসে। অপরদিকে আলাউদ্দীন মুহাম্মাদের সন্তান জালালুদ্দীন মানকাবারতী ভারত থেকে ৬২২ হিজরী সনে নিজ দেশে ফিরে আসেন। তিনি ইতিপূর্বে চেঙ্গীস খানের সৈন্যের সামনে টিকতে না পেরে ভারতে পলায়ন করেছিলেন। দেশে ফিরে এসেই তিনি মোগলদের বিপদ দূর করার কাজে মনোনিবেশ করেন। প্রথমেই তিনি তার পিতার সৈন্যদের ঐক্যবদ্ধ করেন। অতঃপর ইরাকীয় আরব ও অনারবদের উপর আধিপত্য বিস্তার করেন। তাদের ভূমি দখল ও সম্পদ লুণ্ঠন করেন। অবশেষে তিনি বাগদাদের জন্য বড় হুমকী হয়ে দাঁড়ান। এ কারণে মুসলিম নেতারা ঐ বছরই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। এজন্য আশরাফ বিন মালাক আল-আদিল আয়ূবী ও রোমের শাসক কীফান বিন কায়খসরু ঐক্যবদ্ধ হয়ে জালালুদ্দীন মানকাবারতীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং তাকে পরাস্ত করেন। অপরদিকে ৬২৮ হিজরী (১২৩১/১২৩২) সনে মোগলররা জালালুদ্দীন মানকাবার্তীর উপর প্রচন্ড ও ন্যক্কারজনক আক্রমণ করে। এতে তিনি পাহাড়ের দিকে পলায়ন করেন। কিন্তু তার শেষ রক্ষা হয়নি। কোন এক কুর্দীর হাতে তিনি নিহত হন।
এতো ছিল পূর্ব ইসলামী বিশ্বের অবস্থা। কিন্তু অন্যান্য ইসলামী বিশ্বের অবস্থা ছিল ভিন্নতর। আরব উপদ্বীপ, মিসর এবং সিরিয়ার একটি বড় অংশ সুলতান ছালাহুদ্দীন আইউবীর কর্তৃত্বে ছিল। কিন্তু ৬১৫ হিজরী সনে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানরা রাজ্য ভাগ নিয়ে পরস্পরে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এতে মুসলিম শক্তি দুর্বল হ’তে থাকে। অপরদিকে খৃষ্টান অপশক্তি বারংবার সিরিয়া, ফিলিস্তীন ও মিসরে আঘাত হানতে থাকে। মুসলমানদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও তাদের উপর খৃষ্টানদের অব্যাহত হামলা মোগলরা পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। তারা যখন বুঝতে পারে যে, মুসলমানগণ এখন পুরোপুরি দুর্বল তখনই তারা বাগদাদে হামলা করে ধ্বংসলীলা চালায়।
তাতারদের ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী:
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাতারদের ব্যাপারে কিছু অমরবাণী রেখে গেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি হাদীছ নিম্নে উল্লেখ করা হ’ল।-
আমর ইবনু তাগলিব (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমরা ক্বিয়ামতের আগে এমন এক জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করবে যারা পশমের জুতা ব্যবহার করে এবং তোমরা এমন এক জাতির সঙ্গে লড়াই করবে যাদের মুখমন্ডল হবে পিটানো ঢালের মত’।[19]
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘ততদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতদিন তোমরা এমন তুর্কী জাতির বিপক্ষে যুদ্ধ না করবে, যাদের চোখ ছোট, চেহারা লাল, নাক চেপ্টা এবং মুখমন্ডল পেটানো চামড়ার ঢালের মত। আর ততদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতদিন না তোমরা এমন এক জাতির বিপক্ষে যুদ্ধ করবে, যাদের জুতা হবে পশমের’।
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামত ততদিন সংঘটিত হবে না, যতদিন না মুসলিমগণ তুর্কী (কাফিরদের) সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তুর্কীরা এমন এক জাতি, যাদের চেহারা ঢালের মত এবং তারা পশমের জুতা ব্যবহার করবে’।
আব্দুল্লাহ্ ইবনু আমর (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, ‘তোমরা হাবশীদের অবকাশ দাও, যতদিন তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না হয়। কেননা কা‘বা ঘরের সম্পদ তো সে ক্ষুদ্র পায়ের গোছা বিশিষ্ট হাবশী লোকটি বের করে নেবে’।
এ সকল হাদীছ বর্ণনা করার পর ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, মুসলমানগণ উমাইয়া শাসন আমলে এ সকল তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। মুসলমানদের হাতে একটির পর একটি দেশ বিজয়ের জন্য তারাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মুসলমানদের হাতে তাদের অনেকে বন্দি হয়। তাদের ক্ষমতা ও শক্তির কারণে তাদেরকে দলে আনার জন্য রাজা-বাদশারা প্রতিযোগিতা করতে থাকেন। এমনকি খলীফা মু‘তাছিমের অধিকাংশ সৈন্য তাদের বংশভূত হয়ে যায়। এরপর শাসন ক্ষমতা তুর্কীদের হাতে চলে গেলে তারা মু‘তাছিমের উত্তরাধিকারী মুতাওয়াক্কিল ও তার সন্তানদের একের পর এক হত্যা করে। অবশেষে তুর্কী কুর্দীদের রাজত্বের সাথে সংমিশ্রণ ঘটে। সিরিয়ার শাসন ক্ষমতাও তুর্কীদের হাতে চলে যায়। তারা অনারব রাষ্ট্রসমূহও দখল করে নেয়। অতঃপর এসব রাজ্যসমূহের উপর বিজয় লাভ করে সুবক্তগীনের বংশধররা। অতঃপর সুলজুকের বংশধররা। আর তাদের রাজত্ব ছড়িয়ে পড়ে ইরাক, সিরিয়া ও রোমে। অতঃপর সিরিয়ায় থাকা তাদের অবশিষ্ট অনুসারীগণ নূরুদ্দীন জঙ্গীর বংশধর ছিল। আর এ সকল অনুসারীগণই ছিল ছালাহুদ্দীন আইউবীর পরিবার। এক সময় এরাও তুর্কীদের তুলনায় সংখ্যায় বেড়ে যায় এবং তারা মিসর, সিরিয়া ও হিজায দখল করে নেয়। গুয্য তুর্কীরা হিজরী ৫ম শতকে সুলজুকদের উপর হামলা করে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালায় এবং লোকদের সাথে নির্মম আচরণ করে। এরপর তাতারদের মাধ্যমে মুসলমানদের উপর নেমে আসে মহাবিপদ। কারণ হিজরী ষষ্ঠ শতকের পরে চেঙ্গীস খানের আবির্ভাব ও পুরো পৃথিবীকে বিশেষতঃ সমগ্র প্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করে, যাতে এমন কোন দেশ ছিল না যেখানে তাদের অনিষ্ট প্রবেশ করেনি। অতঃপর তাদের হাতে বাগদাদের পতন এবং ৬৫৬ হিজরীতে খলীফা মুসতা‘ছিম বিল্লাহ নিহত হন। এরপর চেঙ্গীস খানের বাকী অনুসারীরা ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে থাকে। তাদের সর্বশেষ শাসক তায়মুর লঙ সিরিয়ার বাড়ি-ঘরকে পদদলিত করে তাতে ধ্বংসলীলা চালায়। সে রাজধানী দামেষ্ককে আগুন জ্বালিয়ে এমনভাবে পুড়িয়ে দেয় যে, শহরটির ঘরবাড়ির ছাদ সমূহও ভিতের উপর মুখ থুবড়ে পড়ে। সে রোম, ভারত ও এ দু’টির মাঝে বহু রাষ্ট্রে ক্ষমতা বিস্তার করে। তার মৃত্যু অবধি তার শাসনকাল দীর্ঘায়িত হয়। অতঃপর তার সন্তানরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু দেশ জয় করে। যা রাসূল (ছাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব প্রতিফলন’। রাসূল (ছাঃ) বলেন, বনু কান্ত্বুররা আমার উম্মতের রাজত্ব প্রথম ছিনিয়ে নিবে। আর বনু কান্ত্বুর দ্বারা উদ্দেশ্য তুর্কীরা। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা হাবাশীদের অবকাশ দাও, যতদিন তারা তোমাদের অবকাশ দেয়। আর তোমরা তুর্কীদের অব্যাহতি দাও যতদিন তারা তোমাদের অব্যাহতি দেয়’।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, এ সকল ঘটনা রাসূল (ছাঃ)-এর মু‘জেযা। এই তুর্কীদের যুদ্ধ সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) যেভাবে বর্ণনা করেছেন, সেভাবেই ঘটনাসমূহ ঘটেছে। যেমন তাদের চোখ ছোট, চেহারা লাল, নাক চেপ্টা, মুখমন্ডল পেটানো চামড়ার ঢালের মত, পশমের জুতা পরিধান করা ইত্যাদি নিদর্শন আমাদের সময়ে দেখতে পেয়েছি। মুসলমানগণ তাদের সাথে বহুবার যুদ্ধ করেছে এবং এখনও করছে। এটি ছিল ইমাম নববী (রহঃ)-এর সময়কার ঘটনা।
চেঙ্গীস খানের পরিচয়:
১১৫৮ খৃষ্টাব্দে ইয়াসূজাঈ মারা গেলে ক্ষমতায় আসে তার ছোট ছেলে তায়মূজীন। কর্মদক্ষতা ও চাতুরতার কারণে মাত্র তের বছর বয়সে তিনি চেঙ্গীস খান পদবী লাভ করেন। ক্ষমতায় এসেই তায়মূজীন বিভক্ত মোগল ও তাতারদের ঐক্যবদ্ধকরণে সচেষ্ট হন। ত্রিশ বছর যাবৎ তিনি অভ্যন্তরীণ শত্রুদের দমন ও বিক্ষিপ্ত জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে অতিবাহিত করেন। ১২০৬ সালে তায়মূজীন গোত্র প্রধানদের জন্য ভোজনের ব্যবস্থা করেন। সেখানে উপস্থিত করা হয় গণক, জাদুকর, বক্তা ও পুরোহিতদের। তারা জনসম্মুখে ঘোষণা করেন যে, আজ তায়মূজীনের এমন এক সম্মানজনক উপাধির জন্য আকাশ খুলে গেছে যা তার পূর্ববর্তীদের জন্য খুলেনি। আজ থেকে তার নাম হয়ে গেল চেঙ্গীস খান। অর্থাৎ ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। এভাবে তিনি তেতালিলশ বছর বয়স অবধি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাজ্য পরিচালনা করেন। চেঙ্গীস খান অভ্যন্তরীণ শত্রুদের থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করলে দেশের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে একটি নিয়মের আওতায় আনতে সচেষ্ট হন। আর এজন্য ‘ইয়াসাক্ব’ বা ‘ইয়াসাহ’ নামে একটি নীতিগ্রন্থ রচনা করা হয়। কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন ইয়াসাহ অর্থ রাজনীতি। পরবর্তীতে মিসরীয়রা এর পূর্বে সীন ও তারও পূর্বে আলিফ-লাম যুক্ত করে। ফলে এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা শব্দটিকে আরবী বলেই মনে করতে থাকে। ইয়াসাহ তুর্কী অর্থে ‘আল-কানূনুল মুজতামাঈ’ বা সামাজিক বিধিবিধান।
চেঙ্গীস খান যে সকল বিষয় এ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেন তা হ’ল- যে ব্যভিচার করবে তাকে হত্যা করা হবে। যে ব্যক্তি মিথ্যা বলবে, যাদু করবে, কাউকে বিনা দোষে আটকে রাখবে বা বিবদমান দুই দলের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে একদলের পক্ষ নিবে ও সাহায্য করবে তাকে হত্যা করা হবে। যে ব্যক্তি পানি বা ছাইয়ে পেশাব করবে তাকে হত্যা করা হবে। যাকে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে মালপত্র দেওয়া হ’ল তৃতীয়বারের পরেও যদি সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহ’লে তাকে হত্যা করা হবে। যদি কোন লোক কোন বন্দিকে সে গোত্রের অনুমতি ব্যতীত খাবার দেয় বা বস্ত্র দেয় তাহ’লে তাকে হত্যা করা হবে। যদি কোন দাস বা বন্দি পলায়ন করে অতঃপর অন্য কোন ব্যক্তি তাকে আশ্রয় দেয় ও মূল মালিককে ফিরিয়ে না দেয় তাহ’লে তাকে হত্যা করা হবে।
প্রাণী যবেহ করার ব্যাপারে উক্ত গ্রন্থে বলা হয়, পশুটির চার পা শক্ত করে বেঁধে দিবে এরপর সেটি না মরা পর্যন্ত তার হার্টে আঘাত করতে থাকবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মুসলমানদের ন্যায় প্রাণী যবেহ করবে তাকেও যবেহ করা হবে। যুদ্ধের সময় যে ব্যক্তির বস্ত্র বা কোন মাল-সামান পড়ে যাবে। তার পিছনে থাকা ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হবে সেখানে নেমে তা কুড়িয়ে নেওয়া। এটি না করলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদন্ড।
শিষ্টাচার সম্পর্কে উক্ত গ্রন্থে বলা হয়, কোন ধরনের স্বজনপ্রীতি ব্যতীত সকলকে সমানভাবে সুবিধা দিতে হবে। যেমনভাবে শর্ত করা হয়েছিল যে, আলী (রাঃ)-এর পরিবারের প্রতি কোন বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হবে না। তাদের প্রতি কোন ধরনের অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে না। অনুরূপভাবে কোন আলেম-ওলামা, ক্বারী, ফক্বীহ, চিকিৎসক, যাহিদ, আবেদ, মুওয়াযযিন, মৃত্যুকে গোসলদানকারী এমনকি ফক্বীর-মিসকীনদেরকেও বিশেষ কোন সুবিধা দেওয়া হ’ত না।
পারস্পরিক চলা-ফেরার ক্ষেত্রে তাদের নীতি নির্ধারণ করা হয়েছিল এই যে, মেহমান ততক্ষণ পর্যন্ত খানা খেতে পারবে না, যতক্ষণ না মেযবান খাবার গ্রহণ করবে। যদিও মেযবান আমীর হয় এবং মেহমান বন্দি হয়। কেউ একাকি খাবার গ্রহণ করতে পারবে না। বরং তার যতদূর পর্যন্ত দৃষ্টি যাবে এবং যতজন লোকজন দেখবে ততজন লোককে সাথে নিয়ে খাবার গ্রহণ করবে। প্রজারা যতক্ষণ না খেয়ে পরিতৃপ্ত হবে, ততক্ষণ আমীর খাবার খেয়ে পরিতৃপ্ত হবে না। বরং আমীর এবং মা‘মূর সকলের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিতে হবে। যদি কোন লোক কোন খাদ্যগ্রহণরত গোত্রের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তাহ’লে তাদের সাথে বসে তাদের অনুমতি ব্যতীত তাদের খাবার গ্রহণ করতে পারবে। কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না। তাদের অন্যতম নীতি ছিল এই যে, তারা পানির ভিতর হাত প্রবেশ করিয়ে পানি ব্যবহার করত না। বরং তারা পানি তুলে হাত ও মুখ ধৌত করত। তারা তাদের পোশাক কখনো ধৌত করত না। এমনকি পোশাকটি ছিড়ে না যাওয়া পর্যন্ত তারা ধৌত করার প্রয়োজন বোধ করত না। তারা পবিত্র ও অপবিত্রতার মধ্যে কোন পার্থক্য করত না।
তাদের কিতাবে এও ছিল যে, তারা কেউ নামের সাথে উপাধি ব্যবহার করতে পারবে না। বরং আমীর ও মন্ত্রীবর্গ কেবল মূল নামে পরিচিত হবেন। তারা নিজেদের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছিল যে, তারা প্রতিবছর তাদের কুমারী মেয়েদের বাদশার নিকট উপস্থাপন করবে। বাদশাহ যাদেরকে ইচ্ছা নিজের বা নিজ সন্তানদের ভোগ্যবস্ত্ত হিসাবে গ্রহণ করবেন। তাতে এও লিখা ছিল যে, যদি কোন বড় নেতাও অপরাধ করে ফেলেন আর তার শাস্তি বাস্তবায়ন করার জন্য সুলতান প্রতিনিধি প্রেরণ করেন, তাহ’লে উক্ত নেতার জন্য আবশ্যক হবে বিনয় ও নম্রতার সাথে দূতের আনুগত্য করা, যাতে তিনি বাদশার নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে পারেন। যদি এক্ষেত্রে নিজের প্রাণও চলে যায় তবুও। তিনি দ্রুততম ডাক ব্যবস্থা চালু করেন। যাতে দেশের যেকোন স্থানের সংবাদ দ্রুত জানতে পারেন। মৃত্যুর পূর্বে চেঙ্গীস খান তার সন্তান জিগতাঈকে ‘ইয়াসাকে’ বর্ণিত বিধান সমাজে বাস্তবায়ন করার নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি মারা গেলে তার সন্তান ও অনুসারীরা তাদের সংবিধান ‘ইয়াসাক’ বা ‘ইয়সার’ বিধান সমাজে চালু করেন যেমনভাবে মুসলমানেরা কুরআনের বিধান সমাজে চালু করে। তারা ঐক্যমতে এটিকে ধর্মীয় গ্রন্থ হিসাবে গ্রহণ করে। এগুলো ছাড়াও অনেক নিয়ম-নীতি ছিল যেগুলোর কিছু ভাল, কিছু মন্দ। তাদের বিধানসমূহ ভালো-মন্দ যাই হৌক না কেন, সমাজে এর প্রচলন তাতারদের ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যাপক সহায়তা করে। এ থেকেই তারা একের পর এক মুসলিম বিশ্বের উপর হামলা করে বহু মুসলিম এলাকা দখল করে নেয়।
তাতারদের আদ্যোপান্ত (২)
তাতারদের বিজয়াভিযান ও ধ্বংসলীলা:
লোকেরা তাতারদের বাগদাদ ধ্বংসের কথা জানলেও এর পূর্বে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা ও বহু শহরকে ধ্বংস করার ঘটনা অনেকে জানে না। তারা বহু শহর ধ্বংস ও দখল করে। অতঃপর তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র বাগদাদ দখল করে। বাগদাদে পৌঁছার পূর্বে তারা যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল তার ভয়াবহতা সম্পর্কে ইবনুল আছীর (রহঃ) আক্ষেপ করে বলেছিলে, ‘হায়! আমার মা যদি আমাকে জন্ম না দিতেন! হায়! আমি যদি এই ঘটনার পূর্বে মৃত্যুবরণ করতাম এবং একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতাম’। বিশ্ববিজেতা আলেকজান্ডারও এত দ্রুত বিশ্ব জয় করতে পারেননি। তিনি বিশ্ব জয় করেন প্রায় দশ বছরে। এতে তিনি কাউকে হত্যা করেননি। লোকেরা তার আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছিল। আর তাতাররা পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্রকে মাত্র এক বছরে দখল করে নেয়।
ইবনুল হাদীদ বলেন, তাতারদের ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ) যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন আমরা তা স্বচক্ষে দেখেছি এবং আমাদের সময়ে তা ঘটেছে। ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই লোকেরা এরূপ পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করছিল। অবশেষে এটি আমাদের যুগে এসে বাস্তবায়িত হ’ল। তাতার বাহিনী যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল তা মানব ইতিহাসে বিরল। তারা প্রথমে মুসলিম বিশ্বের প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করেনি। কিন্তু কতিপয় মুসলিম নেতার অতিলোভ ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তারা মুসলিম বিশ্বের প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়ে উঠে। তাতাররা পূর্ব চীন সীমান্তের কাছে ত্বামগাজা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করত। তাদের ও মুসলিম বিশ্বের মাঝে ছয় মাস পথের দূরত্ব ছিল। খোয়ারিযম শাহ মুহাম্মাদ বিন তুকুস মা-ওয়ারাউন নাহার (বর্তমান আফগানিস্তান ও কাযাকিস্তান) রাজ্যের ক্ষমতায় আসীন হয়েই আশ-পাশের শহরগুলো দখল করে নেন এবং এর নেতাদের হত্যা করেন। শহরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ’ল- বুখারা, সামারকান্দ, বালাসাগুন, কাশগড় প্রভৃতি। এ শহরগুলো মূলতঃ মুসলমান ও তাতারদের মধ্যে একটি বড় প্রতিবন্ধক ছিল। কিন্তু এর শাসকদের হত্যা করা হ’লে পুরো এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব চলে আসে খোয়ারিযম শাহের উপর। যা সামাল দেওয়া তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। কাশগড় ও বালাসাগুনের নেতারা খোয়ারিযম শাহের ব্যবসা-বাণিজ্যের সকল পথ বন্ধ করে দেয়। তাদের বিশ হাযারের একটি দল সমবেত হয়। যারা বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত ছিল। যারা একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল ছিল। তারা তুর্কিস্তানে চলে যায়। সেখানে খোয়ারিযম শাহের সৈন্য ও কর্মকর্তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং বহু শহর দখল করে নেয়। খোয়ারিযম শাহের অবশিষ্ট সৈন্যরা ফিরে আসে এবং তারা তাতারদের হাত থেকে রক্ষা পায়। এক্ষেত্রে তিনি ধৈর্যধারণ করেন। তাছাড়া তিনি দেখলেন যে, সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে তার রাজ্য বিস্তার সম্ভব নয়। এজন্য তিনি তুর্কিস্তানকে তাদের জন্য ছেড়ে দেন। তিনি দৃঢ়ভাবে এটি স্থির করে নেন যে, তুর্কিস্তান তাদের জন্যই। আর এটা ব্যতীত মা-ওয়ারাউন নাহারের অন্যান্য রাজ্য যেমন সামারকান্দ, বুখারা এবং অন্যান্য রাজ্যসমূহ খোয়ারিযম শাহের জন্য। এভাবে চার চারটি বছর অতিক্রান্ত হ’ল। অপরদিকে চেঙ্গীস খান চিন্তা করে দেখলেন যে, তাতারদের একটি অংশের নির্দিষ্ট কোন ভূখন্ড নেই। তিনি রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হ’লেন। তিনি সকলের নেতা হওয়ার মনস্কামনা করলেন। শুরু হ’ল বিজয়াভিযান। চীন সীমান্তে বসবাসরত সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে অভিযানে নেমে পড়লেন। অবশেষে তারা তুর্কিস্তানের সীমান্তে পৌঁছে যান এবং তথাকার সীমান্ত রক্ষীদের সাথে যুদ্ধ করে বিজয় লাভ করেন।
তাতার ব্যবসায়ীদের হত্যা:
তাতার নেতা চেঙ্গীস খান নিজ এলাকা ছেড়ে তুর্কিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযানে বেরিয়ে পড়েন। অন্য দিকে ব্যবসায়ী ও তুর্কীদের একটি দল স্বর্ণ-রৌপ্যসহ পরিধেয় বস্ত্র ক্রয়ের জন্য সামারকান্দ ও বুখারার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। কোন বর্ণনায় রয়েছে, চেঙ্গীস খান তার নিজের ও পরিবার- পরিজনের জন্য পোশাকাদি ক্রয় করার জন্য ব্যবসায়ীদের পাঠিয়েছিলেন। তারা খোয়ারিযম শাহের দখলকৃত সর্বশেষ শহর আওয়াতুরারে অবস্থান গ্রহণ করে। এদের গমন সম্পর্কে জানতে পেরে তথাকার গভর্নর তাদের ব্যাপারে করণীয় জানতে চেয়ে খোয়ারিযম শাহের নিকট পত্র লিখেন। তিনি তাতে এও লিখেন যে, তাদের নিকট বহু অর্থ-সম্পদ রয়েছে। তিনি এ সংবাদ জানতে পেরে গভর্নরকে নির্দেশ দেন যে, ব্যবসায়ীদের হত্যা করে তাদের সাথে থাকা যাবতীয় সম্পদ তার নিকট পাঠিয়ে দিবে। গভর্নর তাই করলেন। খোয়ারিযম শাহের নিকট সেগুলো পৌঁছলে তিনি তা বুখারা ও সামারকান্দের ব্যবসায়ীদের মাঝে বিতরণ করে তার কিছু মূল্য নিজেও নিলেন। এদের হত্যা করে খোয়ারিযম শাহ তাতার গোষ্ঠী ও তাদের নেতা, তাদের সংখ্যা, তাদের সাথে থাকা তুর্কীদের পরিমাণ ও তাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য গোয়েন্দা প্রেরণ করেন। গোয়েন্দারা দীর্ঘ দিন পর ফিরে এসে সংবাদ দিল যে, তারা সংখ্যায় অগণিত, যুদ্ধে অকুতোভয়, আল্লাহর সৃষ্টি জগতে মহা ধৈর্যশীল ও অপরাজিত। তারা নিজেরাই স্বহস্তে অস্ত্র তৈরী করে। এই বর্ণনা শুনার পর খোয়ারিযম শাহ ব্যবসায়ীদের হত্যা ও তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করার কথা স্মরণ করে লজ্জিত হ’লেন। তিনি বিমর্ষ হয়ে তাঁর আস্থাভাজন বিশিষ্ট ফকীহ ও চিন্তাবিদ শিহাব খুয়ূফীর নিকট গমন করে তার নিকট করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ চেয়ে বললেন, বিরাট ঘটনা ঘটে গেছে যার জন্য সুচিন্তিত পরামর্শের প্রয়োজন। কারণ বিশাল তাতার বাহিনী আমাদের দেশে আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছে। ফক্বীহ ছাহেব পরামর্শ দিলেন, আমাদের সৈন্যও তো অনেক। আমরা সৈন্য সমাবেশ ঘটাব এবং যুদ্ধ যাত্রায় সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ বৈধ করে দিব। আপনাকে জান-মাল দিয়ে সাহায্য করা মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হয়ে যাবে। অতঃপর সকল সৈন্যকে সাথে নিয়ে সায়হুন নদীর তীরে অবস্থান গ্রহণ করব। এরপর নদী পাড়ি দিয়ে শত্রুরা আগমন করলে আমরা তাদের প্রতিহত করব। তারা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে থাকবে। আর আমরা নিজ ভূমিতে আরামে থেকে যুদ্ধ করব। অবশেষে তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাবে। পরামর্শ শুনে খোয়ারিযম শাহ তার মন্ত্রীবর্গ ও সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসলেন। তাদের কাছে পরামর্শ চাইলে নেতারা ফকীহ ছাহেবের বিপরীত পরামর্শ দিল। তারা বলল, আমরা তাদের নদী পাড়ি দিয়ে তীরে উঠতে দিব। তারা এই সংকীর্ণ ভূমি ও পাহাড় অতিক্রম করবে। তারা পথ সম্পর্কে অজ্ঞাত। আর আমরা পূর্ণ জ্ঞাত। আমরা সুযোগ বুঝে তাদের উপর হামলা করতে পারব।
চেঙ্গীস খানের দূতকে হত্যা:
আলোচনা-পর্যালোচনার মধ্যেই চেঙ্গীস খানের দূত একদল গোয়েন্দা নিয়ে হাযির। যারা খোয়ারিযম শাহকে ধমকিয়ে বলছিল, তোমরা আমাদের সাথী ও ব্যবসায়ীদের হত্যা করেছ। তাদের থেকে আমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছ! যুদ্ধের জন্য প্রস্ত্ততি গ্রহণ কর। আমরা তোমাদের নিকট এমন সৈন্য বাহিনী নিয়ে আগমন করব যা তোমরা ইতিপূর্বে দেখনি। অপরদিকে চেঙ্গীস খান তুর্কিস্তানের দিকে অভিযান পরিচালনা করে কাশগড়, বেলাসাগূন, এবং অত্র অঞ্চলের সকল শহর দখল করে পূর্ব থেকে দখলকারী আরেকটি তাতার গোষ্ঠীকে অপসারণ করেন। খোয়ারিযম শাহ এসকল সংবাদ জানতে পেরে চেঙ্গীস খানের দূতকে হত্যা করেন এবং সাথে থাকা গোয়েন্দাদের দাড়ী মুন্ডন করে পাঠিয়ে দেন। তাতার গোয়েন্দাদের এ সংবাদ দিয়ে চেঙ্গীস খানের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হয় যে, হে চেঙ্গীস খান! খোয়ারিযম শাহ আপনাকে বলেছেন যে ‘আপনি পৃথিবীর শেষ প্রান্তে অবস্থান করলেও আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রতিশোধ নিব। আপনার সাথে সেই আচরণই করব যে আচরণ আপনার সাথীদের সাথে করেছি’। অর্থাৎ আপনাকে হত্যা করা হবে। খোয়ারিযম শাহ প্রস্ত্ততি নিলেন। সৈন্য নিয়ে দ্রুত চীনের পথে রওয়ানা দিলেন। চার মাসের পথ অতিক্রম করে তাদের আবাসভূমিতে পৌঁছে গেলেন। কিন্তু নারী-শিশু ও বৃদ্ধদের ব্যতীত কাউকে সেখানে পেলেন না। তাদের উপর হামলা করে বহু গণীমতের সম্পদ হস্তগত করলেন এবং নারী ও শিশুদের বন্দি করলেন। তাতারদের বাড়িতে না থাকার কারণ হ’ল- তারা তুর্কী শাসক কেশলুখানের বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়েছিল। তারা তুর্কীদের সাথে যুদ্ধ করে তাদের পরাজিত করে এবং বহু গণীমতের মাল লাভ করে। তারা বাড়ি ফিরার পথে মুসলমানদের আগমন ও নারী-শিশুদের বন্দির কথা জানতে পারে। দ্রুত পথ চলা শুরু করলে তারা মুসলমানদের তাদের আবাস ভূমিতে পেয়ে যায়। মুসলমানরা তাদের আগমনের কথা জানতে পেরে সেখানেই যুদ্ধের জন্য কাতার বন্দি হয়ে গেল। উভয় দলের মধ্যে ইতিহাসের এক ভয়াবহ ও অশ্রুতপূর্ব যুদ্ধ সংঘটিত হ’ল। তিনদিন তিনরাত অনবরত যুদ্ধ চলতে থাকলেও জয়-পরাজয়ের ফলাফল নিশ্চিত হ’ল না। কিন্তু উভয় পক্ষের অসংখ্য সৈন্য নিহত হ’ল। মুসলমানগণ তাদের দ্বীন রক্ষার্থে এবং পরাজয় হ’লে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে একথা ভেবে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিলেন। অপরদিকে তাতাররা তাদের পরিবার-পরিজন ও সম্পদ রক্ষার্থে যুদ্ধে চরম ধৈর্যের পরিচয় দেয়। যুদ্ধ এমন কঠিন রূপ ধারণ করে যে, তাদের অনেকে স্বীয় ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে হেঁটে প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করতে থাকে এবং পরস্পরকে ছুরিকাঘাত করতে থাকে। এতে আহত-নিহতদের রক্ত মাটিতে গড়াতে থাকে। রক্ত প্রবাহিত হয়ে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় ঘোড়া পিছলিয়ে যাচ্ছিল। উভয় দলের সৈন্যদের শক্তি ও ধৈর্য নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দেশ-জাতি ও সম্মান রক্ষার লড়াই থেকে কেউ পিছপা হচ্ছিল না। এই যুদ্ধে তাতারদের নেতৃতব দিচ্ছিল চেঙ্গীস খানের ছেলে। চেঙ্গীস খান এ যুদ্ধ সম্পর্কে জানতেন না এবং তিনি তা অনুভব করতেও পারেননি। কারণ এ সময় তিনি কেশলুখানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। এ যুদ্ধে প্রায় বিশ হাযার মুসলিম শাহাদত বরণ করেন এবং অসংখ্য কাফের নিহত হয়।[13] চতুর্থ রাতে প্রত্যেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। কারণ উভয় পক্ষই যুদ্ধকে এড়িয়ে যাচ্ছিল। রাত্রি গভীর হ’লে উভয় দলের সৈন্যরা আলো জ্বালিয়ে স্বঅবস্থানে ফিরে গেল। এরপর তাতাররা তাদের আধ্যাতিক নেতা চেঙ্গীস খানের নিকট ফিরে গেল। মুসলমানগণও বুখারায় ফিরে এসে তাতারদের অবরোধ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করল। কারণ যেখানে চেঙ্গীস খানের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও খোয়ারিযম শাহের সৈন্যরা বিজয় লাভ করতে পারল না সেখানে চেঙ্গীস খান নিজে তার সকল সৈন্য নিয়ে মুসলিম সম্রাজ্যে প্রবেশ করলে তাদের ঠেকানো অসম্ভব। খোয়ারিযম শাহ বুখারা ও সামারকান্দবাসীকে অবরোধের জন্য প্রস্ত্ততি নিতে বললেন এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহে রাখার পরামর্শ দিলেন। এরপর বুখারা ও সামারকান্দ হেফাযতের জন্য বুখারায় বিশ হাযার ও সামারকান্দে পঞ্চাশ হাযার সৈন্য মোতায়েন করে বললেন, ‘তোমরা দেশকে হেফাযত করবে যতক্ষণ না আমরা খোয়ারিযম ও খোরাসানে ফিরে এসে সৈন্য সমাবেশ ঘটাই এবং মুসলমানদের সাহায্য চেয়ে তোমাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করি’। এভাবে উপদেশ দিয়ে তিনি খোরাসানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি জায়হুন (جَيْحُونَ) নদী পাড়ি দিয়ে বালখের সন্নিকটে সৈন্য সমাবেশ ঘটালেন।
বুখারা ধ্বংসে তাতার বাহিনী:
অন্যদিকে তাতার বাহিনী চেঙ্গীস খানের নেতৃত্বে পূর্ণ প্রস্ত্ততি নিয়ে নদী পাড়ি দিয়ে মুসলিম সম্রাজ্যে প্রবেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। খোয়ারিযম শাহের বুখারায় পৌঁছার পাঁচ মাস পর তারা সেখানে উপস্থিত হ’ল। তারা শহরকে অবরোধ করে ফেলল। মুসলিম সৈন্যরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হ’ল। তিন দিন অনবরত কঠিন যুদ্ধ চলল। কিন্তু মুসলিম সৈন্যরা তাতার বাহিনীর সামনে টিকে থাকতে পারল না। তারা শহর ছেড়ে রাতের অন্ধকারে খোরাসানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। সকাল হ’লে শহরবাসী লক্ষ্য করে দেখল যে, কোন মুসলিম সৈন্য নেই। নিরূপায় হয়ে তারা কাযী বদরুদ্দীন খানকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তাতার বাহিনীর কাছে প্রেরণ করল। তারা জনগণের নিরাপত্তা প্রদান করল। কিছু মুসলিম সৈন্য যারা পলায়নে সক্ষম হয়নি তারা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করল। জনগণের নিরাপত্তার কথা শ্রবণ করে তারাও বাইরে বেরিয়ে আসল এবং ৬১৬ হিজরী সনের ৪ই যিলহজ্জ সোমবার শহরের মূল ফটক উন্মুক্ত করে দিল। এরপর কাফেররা বিনা বাধায় বুখারায় প্রবেশ করল। তারা প্রবেশকালীন সময়ে মুসলমানদের সাথে কৃত্রিম ন্যায়পরায়ণতা ও সুন্দর আচরণ প্রদর্শন করল। যদিও তাদের ভিতরে বিরাট দুরভিসন্ধি ছিল। বরং তারা তখন বলছিল, সুলতানের যে সকল সম্পদ তোমাদের নিকট আছে তার সবগুলো আমাদের নিকটে জমা কর। দুর্গে অবস্থানকারী সৈন্যদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সহায়তা কর। চেঙ্গীস খান নিজে শহরে প্রবেশ করে দুর্গ অবরোধ করলেন। তিনি শহরবাসীর উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলেন, ‘কেউ পশ্চাৎগামী হবে না। যে ব্যক্তি পশ্চাৎগামী হবে তাকে হত্যা করা হবে’ অর্থাৎ এখানে সবাই উপস্থিত হবে। অন্যথা হত্যা করা হবে। সকলে উপস্থিত হ’লে তিনি তাদেরকে গভীর গর্ত খনন করতে নির্দেশ দেন। তারা কাঠ, শক্ত মাটি ইত্যাদি দ্বারা গর্ত খনন করলে কাফেররা মসজিদের মিম্বার ও মুসলমানদের ঘরে থাকা কুরআনের অংশগুলো এনে গর্তে নিক্ষেপ করে। ইন্না লিল্লাহ! আল্লাহ ধৈর্যশীল ও সহনশীল না হ’লে ভূমি ধ্বসিয়ে তাদের ধ্বংস করে দিতেন। এরপর তারা দুর্গের দিকে মনোনিবেশ করে। সেখানে চারশত অশ্বারোহী মুসলিম সৈন্য অবস্থান করছিল। তারা বারো দিন অক্লান্ত চেষ্টা করে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখল। তাতারদের কিছু সৈন্যও নিহত হ’ল। কিন্তু তারা আক্রমণ অব্যাহত রাখলে মুসলিম সৈন্যরা দিশেহারা হয়ে পড়ল। অবশেষে তারা সামনে অগ্রসর হয় এবং তাদের বিশেষ বাহিনী দুর্গের প্রাচীরের নিকট পৌঁছতে সক্ষম হয়। এরপর প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হয়। কিছুক্ষণ পরে মুসলিম সৈন্যরা তাদের সাথে থাকা পাথর, আগুন ও তীর তাতারদের সামনে নিক্ষেপ করে। এতে অভিশপ্তরা রাগান্বিত হয়ে সেদিনের মত যুদ্ধ বন্ধ করে। পরের দিন নতুন করে প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু দুর্গে অবস্থানকারী মুসলিম সৈন্যরা ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়ায় বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। কাফেররা প্রচন্ড হামলা চালিয়ে দুর্গে প্রবেশ করল। মুসলমানদের শেষ ব্যক্তি জীবিত থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে শাহাদত বরণ করল। এরপর স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নেতাদের উপস্থিত হ’তে নির্দেশ দেওয়া হ’ল। তারা উপস্থিত হ’লে চেঙ্গীস খান তাদেরকে বললেন, আমি তোমাদের থেকে ঐ স্বর্ণ-রৌপ্য চাই, যেগুলো খোয়ারিযম শাহ তোমাদের নিকট বিক্রয় করেছেন। কেননা সেগুলো আমার ও আমার সাথীদের থেকে নিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর সেগুলো এখন তোমাদের নিকট’। এই নির্দেশের পর যার নিকট যা ছিল তা তার সামনে হাযির করল। এরপর তাদের সম্বলহীন অবস্থায় শহর ছেড়ে চলে যেতে বলা হ’ল। মুসলিম জনগণ এমন অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হ’ল যে, তাদের পরণের কাপড় ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। এবার কাফেররা তাদের শহরে প্রবেশ করে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে যাদেরকে গৃহে পেল তাদের হত্যা করে সকল সম্পদ লুটে নিল। এরপর অসহায় সম্বলহীন মুসলমানদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। অতঃপর তাদেরকে হত্যা করার জন্য নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিল। সেদিন ছিল মুসলমানদের জন্য এক কঠিন দিন। সর্বত্র কান্নার রোল পড়ে গেল। তারা বুখারা নগরীতে তান্ডব লীলা চালালো। শহর এমনভাবে ধ্বংস করল যেন এখানে কোন শহর ছিল না। শহরে আগুন লাগিয়ে ঘর-বাড়ি, মসজিদ, মাদরাসা পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। ফলে ইবাদত-বন্দেগী ও জ্ঞান অর্জনের সকল দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তারা নারীদেরও ভাগ করে নিল। বাবার সামনে মেয়েকে, ভাইয়ের সামনে বোনকে ধর্ষণ করা হচ্ছিল। বাধা দেওয়ার মত ক্ষমতা মুসলমানদের ছিল না। তদুপরি অনেকে বাধা দিতে গিয়ে কাফেরদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং অবশেষে শাহাদতের অমিয় শুধা পান করেন। আবার অনেকে মুসলমানদের দুরবস্থা দেখে মৃত্যু কামনা করছিলেন।
সামারকান্দের পথে রওয়ানা:
তাতার বাহিনী বুখারা ধ্বংস করে সামারকান্দের পথে রওয়ানা হয়। সাথে নেয় মুসলিম বন্দিদের। উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে অন্য মুসলমানদের ভয় দেখানো। তারা বালখ ও তিরমীযের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান নেয়। মুসলিম বন্দিদের কঠিন যন্ত্রণা দিয়ে নির্মমভাবে হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। যারা তাদের সাথে হেঁটে যেতে অপারগতা প্রকাশ করে বা অক্ষম হয় তাদেরকে হত্যা করে। সামারকান্দের সন্নিকটে পৌঁছে তারা প্রথমে অশ্বারোহীদের পাঠিয়ে দেয় এবং পদাতিক, বন্দি ও বৃদ্ধদের পিছনে রেখে দেয়। এরপর দলে দলে তাদের পাঠাতে থাকে। যাতে মুসলমানদের হৃদয়ে ভীতি সঞ্চারিত হয়। দ্বিতীয় দিন তারা শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছল। প্রত্যেক দশজন বন্দির হাতে একটি করে পতাকা তুলে দিল। এতে শহরবাসী মনে করল তাদের প্রত্যেকেই যোদ্ধা। তারা শহর অবরোধ করল। তখন সেখানে খোয়ারিযম শাহের পঞ্চাশ হাযার সৈন্য অবস্থান করছিল। তাছাড়া অসংখ্য জনগণ তাতারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্ত্তত ছিল। কিন্তু সৈন্যদের কেউ ভয়ে তাতারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামল না। সাধারণ জনগণের মধ্যে বীর পুরুষেরা যার কাছে যা ছিল তা নিয়ে তাতারদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রচন্ড যুদ্ধ করে তাতারদের পিছু হটাতে সক্ষম হ’ল। কিন্তু জনগণ তাতারদের পাতানো ফাঁদে আঁটকে পড়ল। তারা যখন যুদ্ধ করতে করতে গ্রামের বাইরে মাঠে গিয়ে উপনীত হ’ল। তখন তাতারদের পিছনে থাকা অশ্বারোহী সৈন্যরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। সেখানে প্রচন্ড যুদ্ধে প্রায় সত্তর হাযার জনগণ শাহাদত বরণ করল। এ অবস্থা দেখে খোয়ারিযম শাহের সৈন্যরা আরো ভীত-সন্ত্রস্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ল। সৈন্যদের অবস্থা দেখে সাধারণ জনতা ভীত-বিহবল হয়ে পড়ল। এদিকে সৈন্যরাও নিজেদের মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেল। তারা বলাবলি করছিল যে, আমরা সৈন্য হওয়া সত্ত্বেও আমাদেরকে তাতাররা হত্যা করল না! আমরাওতো তুর্কী, ফলে তারা তাদের নিকট নিরাপত্তার আবেদন করল। তারা মুসলমানদের হত্যার বিষয়টি গোপন রেখে প্রকাশ্যে নিরাপত্তা দান করল। এরপর শহরের দরজা খুলে দেওয়া হ’ল। জনগণ পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ সাথে নিয়ে কাফেরদের সামনে বেরিয়ে আসল। কাফেররা তখন তাদেরকে বলল, তোমাদের অস্ত্র, ধন-সম্পদ ও বাহন আমাদের কাছে সমর্পণ কর। আমরা তোমাদেরকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিব। মুসলমানরা তাই করল। তাদের অস্ত্র ও বাহন হস্তগত হ’লে তাতাররা হত্যাকান্ড শুরু করে দিল। মুসলমান পুরুষদের হত্যা ও নারীদেরকে বন্দি করা হ’ল। চতুর্থ দিন তারা শহরে ঘোষণা করল যে, প্রত্যেকে যেন স্বপরিবারে বাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। এরপরেও যারা বাড়িতে অবস্থান করবে তাদেরকে হত্যা করা হবে। ভয়ে সকল নারী-পুরুষ ও শিশুরা বাইরে বেরিয়ে আসল। তাতাররা সামারকান্দবাসীর সাথে ঐ আচরণ করল যা করেছিল বুখারাবাসীর সাথে। তারা শহরে প্রবেশ করে সকল সম্পদ লুণ্ঠন করল এবং মসজিদ ও প্রতিষ্ঠান সমূহে আগুন লাগিয়ে দিল। এই নিষ্ঠুর জাতি বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরও হত্যা করল। ইতিহাসের এ নির্মম ঘটনা ঘটে ৬১৭ হিজরী সালের মুহাররম মাসে।
খোয়ারিযম শাহের পরাজয় ও মৃত্যু:
খোয়ারিযম শাহ সামারকান্দবাসীকে সাহায্য করার জন্য প্রথমে দশ হাজার ও পরে বিশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য প্রেরণ করেন কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। চেঙ্গীস খান সামারকান্দ দখল করে খোয়ারিযম শাহের দিকে মনোনিবেশ করেন। তিনি সৈন্যদের মাঝে ঘোষণা দেন যে, ‘তোমরা খোয়ারিযম শাহকে খোঁজে বের কর যেখানে অবস্থান করুক তিনি, আকাশে ঝুলে থাকলেও তোমরা তার কাছে পৌঁছবে এবং তাকে পাকড়াও করবে’। তাতারদের এই দলটিকে মুগার্রিবাহ বলা হয়। কারণ তারা খোরাসানের পশ্চিম অঞ্চলে অভিযানে বেরিয়েছিল। তারা গোয়েন্দা সূত্রে খোয়ারিযম শাহের অবস্থান জানতে পেরে বাঞ্জাআব্ নামক স্থানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হ’ল। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা নদী পাড়ি দেওয়ার নৌকা না পেয়ে অস্থির হয়ে পড়ল। তবে তারা বসে থাকেনি। তারা কাঠ দিয়ে একটি হাওয তৈরি করে তাতে গরুর চামড়া পরিয়ে দিল। যাতে তাতে পানি প্রবেশ না করে। এরপর তার মধ্যে তাদের অস্ত্র ও অন্যান্য আসবাব পত্র রেখে দেয়। তারপর হাওযকে নিজেদের সাথে বেঁধে দেয় এবং নিজেরা ঘোড়ার লেজ ধরে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এভাবে তারা একবারেই নদী অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। প্রথমে খোয়ারিযম শাহ তাদের উপস্থিতি বুঝতে পারেননি। ভীত-সন্ত্রস্ত মুসলিম বাহিনী তাতারদের প্রতিহত করতে গিয়ে ব্যর্থ হয় এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পলায়ন করে। খোয়ারিযম শাহ আত্মরক্ষা করতে তার বিশেষ ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে নিসাপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তাতাররাও তাকে অনুসরণ করে চলতে থাকে। সেখানেও মুসলমানেরা তাদের প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়। তিনি জীবন রক্ষার জন্য তার শাসিত মাযান্দারানের পথে রওয়ানা দেন। তাতার বাহিনীও তার পিছু পিছু রওয়ানা দেয়। এরপর তিনি তাবারিস্তানের মারসায় উপনীত হন। সেখানে তিনি সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে জাহাজে আরোহণ করেন। তাতাররা তাদের পিছু নেয় কিন্তু নাগাল না পেয়ে ফিরে আসে। নদীর তীরে একটি সুরক্ষিত দুর্গ ছিল যেখানে তিনি আশ্রয় গ্রহণ করেন। আর সেখানেই তার মৃত্যু হয়। অবশেষে তাতার বাহিনী খোয়ারিযম শাহের সাক্ষাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। তবে ড. হাসান ইবরাহীম হাসান ইবনুল আছীরের বরাতে বলেন, খোয়ারিযম শাহ তাতারদের ভয়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে আশ্রয় নিতে থাকেন। কিন্তু তাতাররা তার পিছু ছাড়েনি। এমনকি তিনি রায় অতঃপর হামাদান হয়ে ইরাক সীমান্তে পলায়ন করেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি নদীতে ডুবে মারা যান। আবার কেউ বলেন, তিনি ভারত বর্ষে চলে আসেন এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়। তবে সঠিক কথা হ’ল তাতারদের ভয়ে তার সার্বিক অবস্থানকে গোপন রাখা হয়।
খোয়ারিযম শাহ্ সম্পর্কে কিছু কথা:
তার নাম আলাউদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনু আলাউদ্দীন তিকাশ। তিনি প্রায় বাইশ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি নিজে একজন আলেম ছিলেন এবং আলেমদের যথেষ্ট সম্মান করতেন। তিনি ফিক্বহ, উছূলসহ বিভিন্ন বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। বিশেষতঃ তিনি হানাফী ফিক্বহে ব্যাপক পারদর্শী ছিলেন। তার রাজত্ব প্রায় অর্ধেক বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ তিনি সর্বাবস্থায় এই কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। সুলজূকী শাসনের পর তার মতো বিস্তৃত ভূমির অধিকারী আর কেউ হয়নি। ইরাক থেকে তুর্কিস্তান পর্যন্ত এবং আফগানিস্তানের গযনী, ভারতের কিছু অংশ, সিজিস্তান, কারমান, ত্বাবারিস্তান, জুরজান, বিলাদুল জিবাল, খোরাসান ও পারস্যের কিছু অংশসহ তিনি বহু এলাকার অধিকারী হন। এই অঞ্চলগুলো তার প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে পরিচালিত হ’ত। তিনি হানাফীদের জন্য বিরাট একটি মাদরাসাও নির্মাণ করে দেন।
মাযান্দারান দখল ও অধিবাসীদের হত্যা:
তাতার মুগাররিবা বাহিনী খোয়ারিযম শাহকে পাকড়াও করতে ব্যর্থ হয়ে তার খোঁজে ও মাযান্দারান দখলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। খোয়ারিযম শাহ তাদের উপস্থিতি জানতে পেরে শহর ত্যাগ করে রায়ে চলে যান। তারা একধরনের বিনা বাধায় শহরটি দখল করে নেয়। এ শহরটিতে মুসলমানদের আধিপত্য থাকলেও তারা কোন সময় শহরটির দেখভাল করত না। তাতার বাহিনী শহরটি দখল করে কাউকে হত্যা কাউকে বন্দি এবং গচ্ছিত সম্পদ লুণ্ঠন করে। অতঃপর শহরে আগুন লাগিয়ে তা ধ্বংস করে দেয়।
রায় নগরের পথে তাতার বাহিনী:
মাযান্দারান ধ্বংস ও দখল করে তাতার বাহিনী রায়ের পথে রওয়ানা দেয়। পথে তারা বাদশাহ খোয়ারিযম শাহের মা, স্ত্রী ও অঢেল সম্পদের সন্ধান পেয়ে যায়। এ সময় খোয়ারিযম শাহের মা ছেলের করুণ অবস্থা অবলোকন করে আত্মরক্ষার্থে বাসভবন ছেড়ে হামাদান ও ইস্ফাহানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তারা তাতার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। এত পরিমাণ সম্পদ তারা পেয়েছিল যে, তা দেখে তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় এবং হৃদয় ভরে যায়। এরূপ দুর্লভ ও মূল্যবান বস্ত্ত তারা ইতিপূর্বে কখনো দেখেনি। এসকল সম্পদ তারা চেঙ্গীস খানের নিকট পাঠিয়ে দেয়। ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন ‘এরপর তারা রায়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় এবং রাস্তায় খোয়ারিযম শাহের মাকে পেয়ে যায়। যার সাথে অঢেল সম্পদ ছিল। সেগুলো তারা নিয়ে নেয়। যাতে প্রত্যেক মূল্যবান ও দুর্লভ মনি-মুক্তার মত বহু সম্পদ ছিল যা পূর্বে দেখা যায়নি।
রায় ও হামাদানে তাতার বাহিনী:
৬১৭ হিজরী সালে তাতার বাহিনী রায় শহরে পৌঁছে যায়। উদ্দেশ্য খোয়ারিযম শাহকে খোঁজে বের করা। তাতার বাহিনীর সাথে স্বার্থান্বেষী কিছু মুসলিম সৈন্য ও সাধারণ দুবৃত্তরাও অংশগ্রহণ করে। যারা সম্পদের আশায় তাতারদের সাথে হাত মিলিয়েছিল। তারা এমন সময় রায়ে প্রবেশ করে যখন জনতা স্বীয় কর্মে ব্যস্ত। কেউবা ঘুমিয়ে দিনের ক্লান্তি দূর করছিল। তারা তাতারদের অনুপ্রবেশ সম্পর্কে অনুভব করতেও পারেনি। তারা শহরে প্রবেশ করে সম্পদ লুণ্ঠন, নারীদের বন্দি, শিশুদের চুরি এবং পুরুষদের হত্যা করে। তারা শহরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে দ্রুত হামাদানের পথে রওয়ানা হয়। সেখানেও ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালায় যা ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে। পথিমধ্যে তারা বহু গ্রাম ও শহরে লুণ্ঠন চালায় এবং নারী-পুরুষ ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর তারা হামাদানের পথে রওয়ানা দেয়। শহরের নিকটবর্তী হ’লে নেতারা অঢেল সম্পদ, কাপড় ও বাহন ইত্যাদি নিয়ে তাদের দরবারে উপস্থিত হয়। উদ্দেশ্য নিজেদের নিরাপত্তা প্রার্থনা করা। তাতার বাহিনী বহু সম্পদ ও বাহন পেয়ে তাদের নিরাপত্তা প্রদান করে। এরপর তারা হামাদান ছেড়ে যানজানের পথে রওয়ানা দেয়। সেখানেও বহু মানুষকে হত্যা ও সম্পদ লুণ্ঠন করে। অতঃপর ধ্বংসলীলা চালিয়ে কাযভীনের পথে রওয়ানা হয়। কাযভীনবাসী শহরে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু তাতাররা অস্ত্রের জোরে শহরে প্রবেশ করলে শহরবাসী তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এক পর্যায়ে যুদ্ধ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তখন তারা একে অপরকে ছুরিকাঘাত করতে থাকে। এতে উভয় পক্ষের অসংখ্য সৈন্য হতাহত হয়। ইবনুল আছীর বলেন, এতে চল্লিশ হাযারেরও বেশী কাযভীনবাসী মুসলিম নিহত হয়।
আযারবাইজানের পথে তাতার বাহিনী:
তাতার বাহিনী হামাদান ও বিলাদুল জিবালে প্রচন্ড শীতে অস্থির হয়ে পড়ে। তাছাড়া সেখানে বরফ জামে যায়। তাদের জন্য অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে। তারা সেখান থেকে পলায়ণ করে আযারবাইজানের দিকে রওয়ানা হয়। পথে গ্রাম ও ছোট ছোট শহরগুলো অতিক্রম করার সময় অধিবাসীদের হত্যা ও ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে। গ্রাম ও শহরগুলোতে আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে দেয়। এরপর তারা তিবরীযের পথে রওয়ানা হয়। যেখানে অবস্থান করছিলেন আযারবাইজানের শাসনকর্তা আওযাব্ক বিন বাহ্লাওয়ান । তিনি দিন-রাত মদ্যপান ও খেল-তামাশায় লিপ্ত থাকতেন। তাই তাতারদের ব্যাপারে তার কোন মাথা ব্যথা ছিল না। জ্ঞান ফিরলে তিনি প্রচুর ধন-সম্পদ, পোশাকাদি ও অগণিত বাহন পাঠিয়ে তাদের সাথে শান্তি চুক্তি করে। এরপর তারা আযারবাইজান ও তিরমীয ছেড়ে অতি ঠান্ডা, বরফ ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা মুক্বানে চলে যায়। সেখানে ধ্বংশলীলা চালিয়ে ‘কারাজ’ শহরের দিকে রওয়ানা হয়। তাদের প্রতিহত করতে দশ হাযার কারাজ বাহিনী গতিরোধ করে। কিন্তু তারা পরাজিত হয় এবং অধিকাংশই নিহত হয়। কারাজ নেতা মুসলিম ঐক্য গড়ে তুলার জন্য আওযাবকের নিকট লোক প্রেরণ করেন এবং আযারবাইজান নেতা তাতে সম্মতি দেন। অনুরূপভাবে তিনি জাযীরা ও খেলাত্বের নেতা আশরাফ বিন মালেক আল-আদেল এর নিকট পত্র প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল শীতকাল অতিবাহিত হ’লে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে তাতারদের প্রতিহত করা। কিন্তু তাতাররা এত দিন অপেক্ষা করল না। তারা শীতকালেই বরফ আচ্ছাদিত কারাজে ঢুঁকে পড়ে। তাদের সাথে যোগ দেয় আওযাবুকের অধিনস্ত তুর্কী রাজা আক্ব্ওয়াস । তিনি পাহাড়ী অঞ্চলের তুর্কী, কুর্দ্দী ও অন্যান্য উপজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তাতারদের সহায়তার জন্য প্রেরণ করেন। তাতার বাহিনী তাদেরকে সাদরে গ্রহণ করে। কারণ তারা ছিল তাদেরই জাতির মানুষ। এরপর তারা কারাজে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে বহু দুর্গ দখল করে নেয়। তারা এগুলোতে আশ্রয় গ্রহণকারীদের হত্যা করে, ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে এবং সেগুলোতে আগুন দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। এ ঘটনাটি সংঘটিত হয় ৬১৭ হিজরী সালের যিলহজ্জ মাসে। অতঃপর তারা তিফলীসের সন্নিকটে পৌঁছলে সুলতান কারাজ তার সকল সৈন্য নিয়ে তাতারদের প্রতিহত করতে এগিয়ে আসে। জওয়াব দেওয়ার জন্য প্রথমে আক্বওয়াশের বাহিনী এগিয়ে আসে। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। নিহত হয় আক্বওয়াশ বাহিনীর বহু সৈন্য। তারা টিকতে না পেরে তাতার বাহিনীর কাছে ফিরে যায়। অন্যদিকে কারাজ বাহিনীও ভয়াবহ যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পরে তাতার বাহিনীর প্রচন্ড হামলায় কারাজ বাহিনী পরাস্ত হয় এবং তাদের বহু সেনা নিহত হয়। তারা ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে এই শহরটিকেও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এদের ধ্বংসলীলা লিখার সময় ইবনুল আছীর আক্ষেপ করে বলেন, -
‘আল্লাহর কসম! যারা আমাদের পরে আগমন করবে ও সময় বহুকাল অতিক্রম করবে। আর দেখবে যে, এ ঘটনা লিপিবদ্ধ তারা অস্বীকার করবে, এটিকে দূরবর্তী ঘটনা মনে করবে। অথচ সত্য তাঁরই (আল্লাহরই) হাতে। অতএব যে ব্যক্তি উক্ত ইতিহাসকে অবিশ্বাস করবে সে যেন অবশ্যই চিন্তা করে যে, আমরা নিজেরাই তা লিখেছি। এমনকি আমাদের যুগের ঐতিহাসিকগণ যারা এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত তাদের প্রত্যেকে এ বিষয়ে ইতিহাস সংকলন করেছেন। এর ব্যাপক পরিশুদ্ধতার কারণে জ্ঞানী-মূর্খ সকলে তা অবগত।
মারাগার উদ্দেশ্যে তাতার বাহিনী:
৬১৮ হিজরীর ছফর মাস। তাতার বাহিনী ৬১৭ হিজরী সন পর্যন্ত কারাজ শহরেই অবস্থান করে। এরপর সেখানে অবস্থান করাকে বিপদজনক মনে করে তিবরীযের পথে রওয়ানা দেয়। কিন্তু তিবরীযের শাসনকর্তা অঢেল ধন-সম্পদ, কাপড় ও বাহনের বিনিময়ে তাতারদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা মারাগার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। তারা মারাগাহ শহরটিকে অবরোধ করে। মারাগার শাসনকর্তা নারী হওয়ায় প্রতিহত করার কেউ ছিল না। সে ‘রুওয়ান্ডেয’ দুর্গে আত্মগোপন করে। আর রাসূল (ছাঃ) বলেছেনا ‘ঐ জাতি কখনও সফলকাম হ’তে পারে না, যারা নারীকে তাদের নেত্রী নির্বাচিত করে’।[45] তারা যখন শহরটিকে অবরোধ করে ফেলল তখন শহরবাসী তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করল। তারা শহরের বাইরে মিনজানীক স্থাপন করে শহরের দিকে এগিয়ে গেল। তাতারদের নিয়ম ছিল মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলে প্রথমে তারা মুসলিম বন্দিদের মানবঢাল হিসাবে ব্যবহার করত। তারা পলায়ণ করে চলে আসলে তাতাররা তাদের হত্যা করত। তারা নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। কারণ তারা নিশ্চিতভাবে জানত যে, সামনে গেলে হত্যা করা হবে এবং পলায়ন করলেও নিশ্চিত মৃত্যু। তাতাররা তাদের পিছনে থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। এভাবে তারা নিজেদেরকে নিরাপদ রাখত। তারা সমর্পণ করেনি।

Okk
উত্তরমুছুন