এবার বাদশাহ শাহজাহানের কথায় আসা যাক। চাল-চলনে, পোশাক-পরিচ্ছদে শাহজাহান একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম ছিলেন। তথাপি এখানেও ঐতিহাসিকরা অনুর্বর ইতিহাসের বীজ বপন করতে বিন্দুমাত্র কসুর করেননি। কিছু কিছু অনুর্বর মস্তিষ্কের অসাধু ঐতিহাসিক সবজান্তা সাধুর বেশ ধারণ করে ইতিহাসের রশি টেনেছেন। তাঁরা মনে করেন যে, বাদশাহ শাহজাহান বিলাসিতা আর প্রাচুর্যের মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খেয়েছিলেন এবং তাঁর চারিত্রিক স্খলন হয়েছিল। স্মিথ বলেন, ‘During the remaining thirty five years of his life he disgraced himself by gross licentiousness’. কিন্তু এই কুৎসিত কদাকার বিকৃত মস্তিষ্কের ঐতিহাসিকরা জানতেন না যে, শাহজাহান তাঁর স্ত্রীকে হারিয়ে শোকে বিহবল হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তাইতো তিনি তাঁর রত্নের মত পুত্র আওরঙ্গজেবকে চিনতে না পেরে অযোগ্য পুত্র দারাশেকোহকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
বাদশাহ শাহজাহান একবার এক স্বপ্নে একটি মসজিদ দর্শন করলেন। তিনি তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী মসজিদটির ছবি এঁকে আনার কথা বললেন। কিন্তু কারো ছবিই তাঁর মনের মত না হওয়াতে তিনি এক দরবেশের শরণাপন্ন হলেন। দরবেশ তাকে জানালেন, ‘আমা অপেক্ষা ঐ বড় দরবেশ যিনি আপনার রান্না করেন’। বাদশাহ যখন রাঁধুনির কাছে গেলেন তখন তিনি বললেন, ‘আমার চেয়ে বড় বুযুর্গ যিনি আপনার পায়খানা পরিষ্কার করে’। এ কথা শুনে বাদশাহর চোখ তো চড়কগাছ। বাদশাহ তাদের কাছে ক্ষমা চাইলেন তাদেরকে চিনতে না পারার জন্য। অবশেষে মেথর সব কথা শোনার পর বললেন, রাজা যে মসজিদের স্বপ্ন দেখেছেন তা আসলে জান্নাতের এক মসজিদ। মেথর ফকির এক শিল্পীকে ডেকে এনে মসজিদটির ছবি এঁকে বাদশাহকে দেখালেন। বাদশাহ এই ছবি দেখে বেশ অবাক হলেন এবং জানালেন যে, এটা তাঁর স্বপ্নের মসজিদের সাথে মিলে যায়। এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর যিনি প্রথমে স্থাপন করবেন তিনি অবশ্যই এমন ব্যক্তি হবেন যার কখনও তাহাজ্জুদের ছালাত কাযা হয়নি। পরে সেই মেথর ফকিরকে আর লোকালয়ে দেখা যায়নি। বাদশাহ তখন ঘোষণা দিলেন যে, এমন ব্যক্তি এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন যার বার বছর তাহাজ্জুদের ছালাত কাযা হয়নি। কোন আলেম আসার সাহস পাননি। অবশেষে বাদশাহ নিজেই প্রথম ইট হাতে নিলেন আর কেঁদে বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি জানতাম না যে তুমি আমাকে এমনিভাবে প্রকাশ করে লজ্জিত করবে। হে আল্লাহ! তোমার শোকর (কৃতজ্ঞতা) যে আমার বার বছর তাহাজ্জুদ বাদ যায়নি’। কোথায় সেইসব অর্বাচিন ও কথিত সাহসী ঐতিহাসিক, যারা এরকম মুত্তাক্বী বাদশার সত্য ইতিহাস বিকৃত করে প্রচার করে? নির্লজ্জ ও বেহায়ার মত সত্য ইতিহাসকে এভাবে জীবন্ত কবর দেয়? শাহজাহানের বিশ্ব সুন্দরী স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও সবকিছু উপেক্ষা করে তিনি বারটি বছর তাহাজ্জুদের ছালাত কাযা করেন নি। এটা দিয়ে প্রমাণিত হয় তিনি উচ্ছৃঙ্খল নাকি সুশৃঙ্খল ছিলেন। কিন্তু বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকেন ঐসব অর্বাচিন ঐতিহাসিকরা। যদিও সত্যপন্থী কিছু ঐতিহাসিক সত্য প্রকাশ করতে কুণ্ঠাবোধ করেন নি। যেমন- B. P. Saksena বলেন, ‘In Shahjahan’s reign the Mughal Empire attained to the zenith of prosperity and affluence’. ডঃ ভি. স্মিথও বলেছেন, ‘Shahjahan’s reign marks the climax of the Mughal dynasty and Empire’.
আওরঙ্গজেব ও তার শাসননীতি: ধর্ম বিদ্বেষের কালোমেঘ
বাদশাহ আওরঙ্গজেব আলমগীর নামে সমধিক পরিচিত। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই মহাপুরুষকে ঐতিহাসিকরা সবচেয়ে বেশি দোষারোপ করেছেন, কালিমালেপন করেছেন তার চরিত্রে, ইচ্ছামত তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছেন। অথচ তাঁরা লম্পট আকবরকে সবচেয়ে উত্তম শাসক রূপে অভিহিত করেছেন। এমনকি মনগড়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে তাকে ন্যায়পরায়ণ ও যোগ্য শাসক বলে বিশ্বের সামনে পরিচয় করেছেন। কিন্তু উন্নত চরিত্রের অধিকারী আওরঙ্গজেবকে অনেক ঐতিহাসিক ‘ঔরঙ্গজীব’ নামে আখ্যা দিয়েছেন। এটা কটাক্ষ ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ তিনি ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ বাদশাহ। অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন যে, তিনি ছিলেন প্রবল হিন্দু বিদ্বেষী। কিন্তু তাঁর সেনাপতি হিসেবে তিনি জয়সিংহ এবং যশোবন্ত সিংহকে নিয়োগ করেছিলেন। এটা কি হিন্দু-বিদ্বেষী কোন শাসকের কাজ হতে পারে? আবার ইতিহাস ঘাটতে থাকলে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁর সময়ে হিন্দু-মুসলিম খুব-ই সুখে-শান্তিতে জীবন-যাপন করত। অন্যান্য ধর্মের লোকজনও তাঁর সময়ে খুব সুখে-শান্তিতে বসবাস করত। মারাঠা নেতা শিবাজীকে কাছে পেয়েও তিনি তাঁর গর্দান না নিয়ে তাকে বন্দি করে রাখেন। এই ভীরু, কাপুরুষ, কুটিল, পাপাচার, রাষ্ট্রদ্রোহী শিবাজীকে ঐতিহাসিকরা মহান শিবাজী রূপে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর নামে ১৯০৫ সাল থেকে শিবাজী উৎসব শুরু হয়েছে। ব্যাপার হল, যে বর্গীদের অত্যাচারের কথা শুনে আজো মানুষ ভয়ে থাকে সেই বর্গীদের নেতা ছিল শিবাজী। মূলতঃ শিবাজী ছিলেন এক ভন্ড নেতা। বাদশাহ আওরঙ্গজেবের কাছে তিনি যখন পরাজয় বরণ করেন তখন আওরঙ্গজেব তার সৈন্যবাহিনীকে বন্দী শিবাজীর প্রতি সবরকম সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিলেন। ঘঠনাক্রমে শিবাজীকে শিষ্টাচার শেখানোর নির্দেশ দিলেন বাদশাহ। এক মারাঠী আত্মীয়ের উপর শিবাজীর দেখাশোনার ভার অর্পিত হয়। দুষ্ট গোয়ালের চেয়ে শূন্য গোয়াল আচ্ছা। চোর ধর্মের কাহিনী শোনে না। শিবাজীর ক্ষেত্রেও তাই ঘটল। শিবাজী ধর্মপালনের জন্য আবেদন করলেন। তাঁর আবেদন মঞ্জুর হ’ল। তিনি ব্রাহ্মণের কাছে পূজার অর্ঘ্য স্বরূপ বজরা ভর্তি মিষ্টি পাঠানোর বিষয়টি বাদশাহকে অবগত করেন। বাদশাহ ভাবলেন যে, অন্যের ধর্মে হস্তক্ষেপ করা ধর্ম বিরোধী কাজ। মহান শাসক আওরঙ্গজেব শিবাজীকে সুযোগ দিয়েছিলেন। আর ধূর্ত শিবাজী সেই সুযোগ নিয়ে নিজেই আমের ঝুড়িতে বসে পালিয়ে যান। কিন্তু একশ্রেণির অসাধু ঐতিহাসিকরা আওরঙ্গজেবের উপর ধর্ম বিদ্বেষের কালিমা লেপন করেছেন। অথচ সস্তা চরিত্রের শিবাজী ঐতিহাসিকের কলমের খোঁচায় দামী মানুষে পরিণত হলেন। বহু মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আওরঙ্গজেব। কই, এই কথা তো গোমড়ামুখো কথিত বোদ্ধা ঐতিহাসিকরা বর্ণনা করেনা! তাঁরা শুধু বলেন থাকেন যে, আওরঙ্গজেব হিন্দু-বিদ্বেষী ছিলেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী হায়দার আকবর খান রনো ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখের ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকায় ‘মৌলবাদের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ’ নামক কলামে লিখেছেন, ‘সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া (যেমন আওরঙ্গজেব) মুসলিম শাসনকালে ধর্মীয় নিপীড়নের কথা জানা যায় না’। এখানে দেখা যায় যে, আওরঙ্গজেবকে নিয়ে রনো সাহেবও মিথ্যাচার করেছেন। সত্য ইতিহাস থেকে বুদ্ধিজীবীরা যেখানে অনেক পিছিয়ে সেখানে স্বল্প জ্ঞানের লোকেদের অবস্থা বড়ই করুণ। আওরঙ্গজেবের শাসননীতি, অর্থনীতি, সাম্যবাদ এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, তা পরবর্তীতে সাম্যবাদী নীতির প্রবক্তা কার্ল মার্কসকেও খুব বেশী আন্দোলিত করেছিল।
