হিল্লাহ কাহিনি, একটি শিক্ষনীয় গল্প


হিল্লাহ কাহিনিঃ


‘খলীলিয়াহ’ নদীর দক্ষিণ প্রান্তে ‘মাহারীক’ শহরের নিকটে একটি ছোট্ট নিরালা স্থান- যা কেবল একজন বুযর্গের ছালাতের জন্য নির্দিষ্ট। জায়গাটি ছোট হ’লেও উহা পাঁচ ওয়াক্তের মুছল্লী হ’তে কখনোই খালি থাকে না। বিশেষ করে জুম‘আর দিন আশপাশের এলাকাসমূহ হ’তে দলে দলে লোক এসে ভিড় করে। ফলে হুজরার আঙ্গিনা ছাড়িয়ে রাস্তার ধারেও মুছল্লীদের জায়গা নিতে হয়। 


খলীলিয়ার তীরে এই ছোট্ট হুজরাটির প্রতি লোকদের এত আকর্ষণের মূল কারণ হ’ল উহার ইমাম মাননীয় শায়খ নাঈম। তাঁর সুনাম-সুখ্যাতি পার্শ্ববর্তী গ্রাম-গঞ্জ পেরিয়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে গেছে। কেননা সকলেরই এ ব্যাপারে অটুট বিশ্বাস যে, উক্ত শায়খের দো‘আ ও আসমানের মাঝে কোন পর্দা নেই। তিনি যা দো‘আ করেন, আল্লাহ তাই-ই কবুল করেন। তাই লোকেরা তাঁর সঙ্গে ছালাত আদায় করা ও তাঁর দো‘আ পাওয়াকে চরম সৌভাগ্য ও পরকালীন মুক্তির উপায় বলে মনে করে। 


শায়খ নাঈম তাঁর জীবনকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছেন। তাঁর সমস্ত কর্মশক্তিকে দ্বীনের তাবলীগ ও লোকদেরকে ‘ছিরাতুল মুস্তাক্বীমের’ দিকে হেদায়াতের কাজে নিয়োজিত করেছেন। যখন তিনি কথা বলেন, তাঁর মুখ দিয়ে কেবল পবিত্র কুরআনের আয়াত, রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ ও বিগত যুগের নেককার ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তসমূহ বেরিয়ে আসে। যখন তিনি রাস্তা দিয়ে চলেন, দৃষ্টি নীচু করে তসবীহছড়া হাতে গুনগুনিয়ে যিকর করতে করতে চলেন। যখন তিনি জুম‘আর খুৎবা দিতে মিম্বরে ওঠেন, শুদ্ধ ভাষায় সুন্দর বক্তৃতা করেন। কখনও সে মুখে অনল বর্ষিত হয়, কখনও বা মধুশ্রাবী বাণী সুধায় মুছল্লীদের হৃদয় বিগলিত হয়। যখন তিনি লাঠিরূপ তরবারিখানা ডাইনে অথবা বামে ঘুরান, সমস্ত হুজরাটা ভয়ে কাঁপতে থাকে, যেন সেখানে ভূমিকম্প লেগেছে। বিস্ফারিত নেত্র, নির্বাক, ভীত-বিহবল শ্রোতাদের লাঠির তালে তালে দোলায়মান অবস্থা দেখলে মনে হয় যেন তাদের যাদুতে পেয়েছে। 


শায়খ নাঈম বিশ্বাস করেন যে, তিনি রাসূলের একজন বংশধর। আল্লাহ তাঁকে এই শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের হেদায়াতের জন্য বেছে নিয়েছেন। কেননা তিনি প্রায়ই স্বপ্নে নিজেকে ফেরেশতা পরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখেন এবং কোন কোন সময় গভীর রাতে গায়েবী আওয়ায দ্বারা তাঁকে জনগণের হেদায়াতের জন্য তাগিদ দেওয়া হয়। সেজন্য কোন রোগীর কথা শুনলেই তিনি সেখানে ছুটে যান। দিবারাত্র জেগে তার শিয়রে বসে তসবীহ তেলাওয়াত করেন। ফকীর-মিসকীনদের সাধ্যমত দান-খয়রাত করেন। কখনও আপনি তাঁকে দেখবেন পাতের খানা অন্যকে দিয়ে নিজে ক্ষুধার্ত থাকছেন। কখনও দেখবেন মাঠে যেয়ে কৃষকদের হালচাষে সাহায্য করছেন। মুখে তাঁর প্রশান্ত হাসি। উদ্দেশ্য কেবল একটাই আল্লাহর সন্তষ্টি। 


শায়খ নাঈম বাড়ী আর হুজরা ছাড়া দুনিয়ায় আর কিছু বুঝেন না। কেবল খানা-পিনার জন্যে যা একটু বাড়ী যান। বাকী সময়টা হুজরায় বসে ভক্তদের উপদেশবাণী শুনান। শায়খের বাড়ীটাকে আপনি রীতিমত একটা ঝুপড়ি বলতে পারেন। সেখানে কেবল তাঁর স্ত্রী থাকেন। যাকে তিনি প্রথম যৌবনে বিবাহ করেছিলেন। যদিও স্ত্রীর বয়স তাঁর চাইতে কয়েক বৎসরের বেশী। মহিলার ইতিপূর্বে একবার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় শায়খ দয়াপরবশ হয়ে তাকে বিয়ে করে ঘরে তুলে নেন। 


একদিন শায়খ নাঈম জুম‘আর ছালাতান্তে বাড়ীর দিকে আসছেন। তসবীহছড়া হাতে নিয়ে যথারীতি অধোমুখে গুনগুনিয়ে চলেছেন। এমন সময় পিছন দিক হ’তে একটা সন্ত্রস্ত কণ্ঠস্বর তাঁর কানে এলো। তিনি চট করে ফিরে তাকিয়ে দেখেন যে, একজন লোক লঘুপদে সসংকোচে তাঁর পিছে পিছে আসছে। তিনি স্নেহভেজাসুরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কে’? আগন্তুক নিজের নাম বললো ‘আব্দুত তাউয়াব’। কোথা হ’তে আসছো? পার্শ্ববর্তী গ্রাম হ’তে। কি খবর? লোকটি শায়খের লম্বা জুববার আস্তীন ধরে ভক্তিভরে চুমু খেয়ে তা চোখের পানিতে ভিজিয়ে দিলো। শায়খ তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, শান্ত হও বাছা। বলো তোমার কিসের কষ্ট? লোকটি তখন সসম্ভ্রমে একপাশে ডেকে নিয়ে শায়খকে নিম্নস্বরে বলল যে, সে তার স্ত্রীকে এক সঙ্গে তিন তালাক দিয়েছে। কিন্তু এখন সে তাকে ফিরে পেতে চায়। 


শায়খ তখন তালাকের ব্যাপারে ভালভাবে নিশ্চিত হওয়ার পরে মাথা নেড়ে ফৎওয়া দিলেন যে, ঐ স্ত্রীর সঙ্গে তার পুনর্মিলন কখনোই সম্ভব নয়। যতক্ষণ না উক্ত স্ত্রীর অন্য কারু সঙ্গে বিবাহ হচ্ছে। লোকটি তখন হতাশ হয়ে বলল, এছাড়া কি অন্য কোন উপায় নেই? শায়খ গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বললেন, না বাছা এ যে আল্লাহর বিধান। 


পরদিন আছর বাদ শায়খ নাঈম হুজরা থেকে বের হয়ে দেখেন যে, গতকালের সেই লোকটি দাঁড়িয়ে। সে তাঁকে একপাশে ডেকে নিয়ে দু’হাত মলতে মলতে মুখ কাচুমাচু করে বলল, ‘হে আমাদের শায়খ! আপনি গতকাল আমার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে অন্যত্র পুনর্বিবাহ দেওয়ার কথা বলেছিলেন, নইলে সে আমার জন্য হালাল হবে না। 


…‘হাঁ নিশ্চয়ই। এছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই’। শায়খের কণ্ঠে দৃঢ়তার সুর। 


লোকটি তখন শায়খের হাতের উপর আরও ঝুঁকে পড়ে প্রায় অস্ফুটস্বরে নিবেদন করলো, ‘যদি আমাদের মহামান্য শায়খ আল্লাহর সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্যে আমার স্ত্রীকে বিবাহ করার খিদমতটুকু দয়া করে আনজাম দিতেন…’? 


কথাটা শোনার সাথে সাথে শায়খের যবান আটকে গেল। তাড়াতাড়ি চাঞ্চল্য ঢাকবার জন্য ঘনঘন তসবীহ গুণতে লাগলেন। অবশেষে লোকটির বারংবার অনুরোধে বাধ্য হয়ে তিনি বললেন, আমাকে একদিন সময় দাও হে আব্দুত তাওয়াব। আমি আল্লাহর নিকট ‘ইস্তেখারা’ করবো। অতঃপর একাজে মঙ্গল আছে… এই মর্মে যদি ‘কাশফ’ হয়, তাহ’লে তোমার দাবী পূরণ করা যেতে পারে। নইলে একেবারেই অসম্ভব। বৎস! তুমি আগামীকাল একবার এসো। আল্লাহ সবকিছুর মালিক’। 


ঐ পর্যন্ত বলেই শায়খ বাড়ীর দিকে পা বাড়ালেন। কিন্তু আগন্তুক যুবক তাঁকে একটু দাঁড়াতে বলে আড়াল থেকে তার স্ত্রীকে সামনে নিয়ে এলো। উদ্ভিন্নযৌবনা, অনিন্দ্যসুন্দরী এই তন্বীবধু লাজনম্রবেশে শায়খের সামনে এসে দাঁড়ালে যুবকটি তাকে শীঘ্র শায়খের হাতে চুমু খেতে বলল। মেয়েটি চুমু খাওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়লে শায়খ ঝট করে হাত টেনে নিলেন এবং চকিতে মেয়েটির সুন্দর মুখের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। এভাবে আচম্বিতে দৃষ্টি বিনিময়ে তিনি লজ্জায় চক্ষু নামালেন এবং যুবকটিকে বললেন, তোমার স্ত্রীকে আজ নিয়ে যাও। আব্দুত তাউয়াব শায়খের হাতে গভীরভাবে চুমু খেয়ে দো‘আ করলো.. ‘আল্লাহ যেন তাঁকে এই নেক কাজের অফুরন্ত ছওয়াব দান করেন’। 


শায়খ বাড়ীর পথ ধরলেন ধীরপদে, অধোবদনে গভীরভাবে যিকরে মশগুল অবস্থায়। মহামতি শায়খ সারাটা রাত সুখস্বপ্নে বিভোর থাকলেন। তিনি স্বপ্নে নিজকে জান্নাতের ফুলবাগিচায় অসংখ্য হূরপরীবেষ্টিত অবস্থায় দেখলেন। তাদের মধ্যে লাজুকলতার মতো আজকের গোধূলীলগ্নের সেই কামনাময়ী তন্বী বধুটিকেও দেখতে পেলেন। 


আনন্দের আতিশয্যে শায়খ ফজরের কিছু আগে-ভাগেই উঠে পড়লেন। অতঃপর ফজর ছালাত শেষে ‘ইস্তেখারা’য় মগ্ন হ’লেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভিন্ন লক্ষণ-প্রমাণের সাহায্যে তিনি পরিস্কার বুঝে নিলেন যে, এ বিয়ে তিনি নিঃসংকোচেই করতে পারেন। 


যথাসময়ে বিবাহকার্য সম্পন্ন হ’ল। ওয়াদামত তালাকও হয়ে গেল। কিন্তু আব্দুত তাউয়াবের স্ত্রী শায়খ নাঈমের মনে এক অনির্বচনীয় সুখানুভূতির স্থায়ী স্বাক্ষর রেখে গেল। তাঁর সমস্ত শিরা-উপশিরায় যেন আগুন ধরে গেল। ঐ সুন্দরী বধুটি হূরের বেশে প্রায়ই তাঁর সঙ্গে মোলাকাত করে, হাসি-ঠাট্টা করে, গল্প-গুজব করে। ফলে রাতটা শায়খের একভাবে কাটলেও সারাটা দিন তার দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনায় অতিবাহিত হ’তে থাকে। 


কখনও শায়খ ভাবেন যে, এই স্বপ্নের পশ্চাতে হয়তবা অদৃশ্য কোন বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে। আবার ভাবেন হ’তে পারে এসব শয়তানী কারসাজি। এমনিতরো ভাবনা-চিন্তার মাঝে একদিন দুপুরে তন্দ্রাবস্থায় তিনি গায়েবী নির্দেশ পেলেন- ‘শান্ত হও নাঈম। তোমার উপর শয়তানের কোন ক্ষমতা নেই। তুমি যে তরীকা তোমার জন্য বেছে নিয়েছ, সেই তরীকার উপরে কায়েম থাকো এবং এই পথে যথাসাধ্য নেককাজ করে যাও’। 


এই ‘ইলহাম’ পাওয়ার সাথে সাথে শায়খ নাঈম ‘আল-হামদুলিল্লা-হ’ বলে উঠে বসলেন। তাঁর চেহারা খুশীতে ঝলমল করে উঠলো। 


আব্দুত তাউয়াবের স্ত্রীকে হালাল করে দেওয়ার ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে এই ধরনের তালাকদাতা স্বামীরা চারদিক থেকে এসে শায়খের নিকট ভিড় করতে লাগলো। কেননা তাদের দৃষ্টিতে মহামান্য শায়খই এ ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত ব্যক্তি। শায়খও কোন পাণিপ্রার্থিনীকে নিরাশ করতেন না। কেননা তাঁর বিশ্বাস যে, তিনি একাজ করছেন স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি হাছিলের জন্য এবং আল্লাহর বান্দাদের উপকার করবার জন্য। তাছাড়া এমন একটি মহান খিদমত হ’তে তিনি কেমনে দূরে থাকতে পারেন, যার দ্বারা দাম্পত্য বন্ধন পুনঃস্থাপিত হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসার সূত্রসমূহ পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়। 


এইভাবে সময় অতিবাহিত হয়। শায়খ নাঈম একটি মহিলাকে তালাক দেন। সাথে সাথে আরেকটি মহিলার পাণি গ্রহণ করেন। ফলে তাঁর প্রতিটি রাতই হয় বাসর রাত। নিত্য নতুন রঙের ঢেউ খেলে যায় তাঁর মনে। যা ইতিপূর্বে কখনই তিনি অনুভব করেননি। 


শায়খ এখন রাস্তায় চলেন সুন্দর ভঙ্গিতে। দাড়িগুলিকে ‘খেযাব’ দিয়ে ঝকঝকে করেছেন। পাগড়ীটার উপরি অংশ ঝান্ডার মত খাড়া করে রাখেন। সুন্নত পালনার্থ সর্বদা আতর মেখে চলেন। কথার মধ্যে বেশ হাস্যরস মিশিয়ে বলেন। কেননা মুমিনকে যে সব সময় খোশমেযাজ থাকতে হয়। 


একদিন বিকালে মহামান্য শায়খ তাঁর ঘরের আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে নদীতে পানি নিতে আসা মহিলাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এমন সময় একটি যুবক সেখানে উপস্থিত হ’ল। সঙ্গে একজন মহিলা। যুবকটি কোন এক বন্দর এলাকার হবে। হালকা-পাতলা গড়নের কুৎসিত এই যুবকটির চেহারায় প্রকাশ পাচ্ছিল যে, সে একজন সমাজ ছাড়া নচ্ছার ব্যক্তি। যাদের কাছ থেকে ঘরের শান্তি ও পারিবারিক শৃংখলা কামনা করা যায় না। 


যুবকটি শায়খের নিকটে এসে গদগদচিত্তে আকণ্ঠ ভক্তি মিশিয়ে বলে উঠলো, ‘হে আমাদের সাইয়েদ (নেতা)! আপনার খাদেম ‘তেহামী’ হাযির’। শায়খ মুচকি হেসে বললেন, ‘হয়েছে, হয়েছে আফেন্দী। এখন বলো তোমার কি ব্যাপার’? 


যুবকটি সংক্ষেপে যা বলল তার মর্ম দাঁড়ায় এই যে, সে তার স্ত্রীকে একসঙ্গে তিন তালাক দিয়ে ফেলেছে। এক্ষণে স্ত্রী ফক্বীহদের ফৎওয়া না শোনা পর্যন্ত তার সঙ্গে বসবাস করতে চায় না। ওদিকে সকল ফক্বীহ বলছেন যে, অন্য কোন পুরুষের সঙ্গে বিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত সে আমার ঘর করতে পারবে না। অতএব একমাত্র এ কারণেই এই অবেলায় হুযূরের দরবারে আসা…’। 


শায়খ ঘটনাটি শোনার সাথে সাথেই এই মহান খিদমত আনজাম দিবার জন্য নিজকে সদা প্রস্ত্তত বলে ঘোষণা করলেন। যুবকটি খুশী হয়ে স্ত্রী ছাবিহাকে শায়খের ঝুপড়িতে রেখে চলে গেল


‘খলীলিয়াহ’ নদীর দক্ষিণ প্রান্তে ‘মাহারীক’ শহরের নিকটে একটি ছোট্ট নিরালা স্থান- যা কেবল একজন বুযর্গের ছালাতের জন্য নির্দিষ্ট। জায়গাটি ছোট হ’লেও উহা পাঁচ ওয়াক্তের মুছল্লী হ’তে কখনোই খালি থাকে না। বিশেষ করে জুম‘আর দিন আশপাশের এলাকাসমূহ হ’তে দলে দলে লোক এসে ভিড় করে। ফলে হুজরার আঙ্গিনা ছাড়িয়ে রাস্তার ধারেও মুছল্লীদের জায়গা নিতে হয়। 


খলীলিয়ার তীরে এই ছোট্ট হুজরাটির প্রতি লোকদের এত আকর্ষণের মূল কারণ হ’ল উহার ইমাম মাননীয় শায়খ নাঈম। তাঁর সুনাম-সুখ্যাতি পার্শ্ববর্তী গ্রাম-গঞ্জ পেরিয়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে গেছে। কেননা সকলেরই এ ব্যাপারে অটুট বিশ্বাস যে, উক্ত শায়খের দো‘আ ও আসমানের মাঝে কোন পর্দা নেই। তিনি যা দো‘আ করেন, আল্লাহ তাই-ই কবুল করেন। তাই লোকেরা তাঁর সঙ্গে ছালাত আদায় করা ও তাঁর দো‘আ পাওয়াকে চরম সৌভাগ্য ও পরকালীন মুক্তির উপায় বলে মনে করে। 


শায়খ নাঈম তাঁর জীবনকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছেন। তাঁর সমস্ত কর্মশক্তিকে দ্বীনের তাবলীগ ও লোকদেরকে ‘ছিরাতুল মুস্তাক্বীমের’ দিকে হেদায়াতের কাজে নিয়োজিত করেছেন। যখন তিনি কথা বলেন, তাঁর মুখ দিয়ে কেবল পবিত্র কুরআনের আয়াত, রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ ও বিগত যুগের নেককার ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তসমূহ বেরিয়ে আসে। যখন তিনি রাস্তা দিয়ে চলেন, দৃষ্টি নীচু করে তসবীহছড়া হাতে গুনগুনিয়ে যিকর করতে করতে চলেন। যখন তিনি জুম‘আর খুৎবা দিতে মিম্বরে ওঠেন, শুদ্ধ ভাষায় সুন্দর বক্তৃতা করেন। কখনও সে মুখে অনল বর্ষিত হয়, কখনও বা মধুশ্রাবী বাণী সুধায় মুছল্লীদের হৃদয় বিগলিত হয়। যখন তিনি লাঠিরূপ তরবারিখানা ডাইনে অথবা বামে ঘুরান, সমস্ত হুজরাটা ভয়ে কাঁপতে থাকে, যেন সেখানে ভূমিকম্প লেগেছে। বিস্ফারিত নেত্র, নির্বাক, ভীত-বিহবল শ্রোতাদের লাঠির তালে তালে দোলায়মান অবস্থা দেখলে মনে হয় যেন তাদের যাদুতে পেয়েছে। 


শায়খ নাঈম বিশ্বাস করেন যে, তিনি রাসূলের একজন বংশধর। আল্লাহ তাঁকে এই শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের হেদায়াতের জন্য বেছে নিয়েছেন। কেননা তিনি প্রায়ই স্বপ্নে নিজেকে ফেরেশতা পরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখেন এবং কোন কোন সময় গভীর রাতে গায়েবী আওয়ায দ্বারা তাঁকে জনগণের হেদায়াতের জন্য তাগিদ দেওয়া হয়। সেজন্য কোন রোগীর কথা শুনলেই তিনি সেখানে ছুটে যান। দিবারাত্র জেগে তার শিয়রে বসে তসবীহ তেলাওয়াত করেন। ফকীর-মিসকীনদের সাধ্যমত দান-খয়রাত করেন। কখনও আপনি তাঁকে দেখবেন পাতের খানা অন্যকে দিয়ে নিজে ক্ষুধার্ত থাকছেন। কখনও দেখবেন মাঠে যেয়ে কৃষকদের হালচাষে সাহায্য করছেন। মুখে তাঁর প্রশান্ত হাসি। উদ্দেশ্য কেবল একটাই আল্লাহর সন্তষ্টি। 


শায়খ নাঈম বাড়ী আর হুজরা ছাড়া দুনিয়ায় আর কিছু বুঝেন না। কেবল খানা-পিনার জন্যে যা একটু বাড়ী যান। বাকী সময়টা হুজরায় বসে ভক্তদের উপদেশবাণী শুনান। শায়খের বাড়ীটাকে আপনি রীতিমত একটা ঝুপড়ি বলতে পারেন। সেখানে কেবল তাঁর স্ত্রী থাকেন। যাকে তিনি প্রথম যৌবনে বিবাহ করেছিলেন। যদিও স্ত্রীর বয়স তাঁর চাইতে কয়েক বৎসরের বেশী। মহিলার ইতিপূর্বে একবার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় শায়খ দয়াপরবশ হয়ে তাকে বিয়ে করে ঘরে তুলে নেন। 


একদিন শায়খ নাঈম জুম‘আর ছালাতান্তে বাড়ীর দিকে আসছেন। তসবীহছড়া হাতে নিয়ে যথারীতি অধোমুখে গুনগুনিয়ে চলেছেন। এমন সময় পিছন দিক হ’তে একটা সন্ত্রস্ত কণ্ঠস্বর তাঁর কানে এলো। তিনি চট করে ফিরে তাকিয়ে দেখেন যে, একজন লোক লঘুপদে সসংকোচে তাঁর পিছে পিছে আসছে। তিনি স্নেহভেজাসুরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কে’? আগন্তুক নিজের নাম বললো ‘আব্দুত তাউয়াব’। কোথা হ’তে আসছো? পার্শ্ববর্তী গ্রাম হ’তে। কি খবর? লোকটি শায়খের লম্বা জুববার আস্তীন ধরে ভক্তিভরে চুমু খেয়ে তা চোখের পানিতে ভিজিয়ে দিলো। শায়খ তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, শান্ত হও বাছা। বলো তোমার কিসের কষ্ট? লোকটি তখন সসম্ভ্রমে একপাশে ডেকে নিয়ে শায়খকে নিম্নস্বরে বলল যে, সে তার স্ত্রীকে এক সঙ্গে তিন তালাক দিয়েছে। কিন্তু এখন সে তাকে ফিরে পেতে চায়। 


শায়খ তখন তালাকের ব্যাপারে ভালভাবে নিশ্চিত হওয়ার পরে মাথা নেড়ে ফৎওয়া দিলেন যে, ঐ স্ত্রীর সঙ্গে তার পুনর্মিলন কখনোই সম্ভব নয়। যতক্ষণ না উক্ত স্ত্রীর অন্য কারু সঙ্গে বিবাহ হচ্ছে। লোকটি তখন হতাশ হয়ে বলল, এছাড়া কি অন্য কোন উপায় নেই? শায়খ গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বললেন, না বাছা এ যে আল্লাহর বিধান। 


পরদিন আছর বাদ শায়খ নাঈম হুজরা থেকে বের হয়ে দেখেন যে, গতকালের সেই লোকটি দাঁড়িয়ে। সে তাঁকে একপাশে ডেকে নিয়ে দু’হাত মলতে মলতে মুখ কাচুমাচু করে বলল, ‘হে আমাদের শায়খ! আপনি গতকাল আমার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে অন্যত্র পুনর্বিবাহ দেওয়ার কথা বলেছিলেন, নইলে সে আমার জন্য হালাল হবে না। 


…‘হাঁ নিশ্চয়ই। এছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই’। শায়খের কণ্ঠে দৃঢ়তার সুর। 


লোকটি তখন শায়খের হাতের উপর আরও ঝুঁকে পড়ে প্রায় অস্ফুটস্বরে নিবেদন করলো, ‘যদি আমাদের মহামান্য শায়খ আল্লাহর সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্যে আমার স্ত্রীকে বিবাহ করার খিদমতটুকু দয়া করে আনজাম দিতেন…’? 


কথাটা শোনার সাথে সাথে শায়খের যবান আটকে গেল। তাড়াতাড়ি চাঞ্চল্য ঢাকবার জন্য ঘনঘন তসবীহ গুণতে লাগলেন। অবশেষে লোকটির বারংবার অনুরোধে বাধ্য হয়ে তিনি বললেন, আমাকে একদিন সময় দাও হে আব্দুত তাওয়াব। আমি আল্লাহর নিকট ‘ইস্তেখারা’ করবো। অতঃপর একাজে মঙ্গল আছে… এই মর্মে যদি ‘কাশফ’ হয়, তাহ’লে তোমার দাবী পূরণ করা যেতে পারে। নইলে একেবারেই অসম্ভব। বৎস! তুমি আগামীকাল একবার এসো। আল্লাহ সবকিছুর মালিক’। 


ঐ পর্যন্ত বলেই শায়খ বাড়ীর দিকে পা বাড়ালেন। কিন্তু আগন্তুক যুবক তাঁকে একটু দাঁড়াতে বলে আড়াল থেকে তার স্ত্রীকে সামনে নিয়ে এলো। উদ্ভিন্নযৌবনা, অনিন্দ্যসুন্দরী এই তন্বীবধু লাজনম্রবেশে শায়খের সামনে এসে দাঁড়ালে যুবকটি তাকে শীঘ্র শায়খের হাতে চুমু খেতে বলল। মেয়েটি চুমু খাওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়লে শায়খ ঝট করে হাত টেনে নিলেন এবং চকিতে মেয়েটির সুন্দর মুখের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। এভাবে আচম্বিতে দৃষ্টি বিনিময়ে তিনি লজ্জায় চক্ষু নামালেন এবং যুবকটিকে বললেন, তোমার স্ত্রীকে আজ নিয়ে যাও। আব্দুত তাউয়াব শায়খের হাতে গভীরভাবে চুমু খেয়ে দো‘আ করলো.. ‘আল্লাহ যেন তাঁকে এই নেক কাজের অফুরন্ত ছওয়াব দান করেন’। 


শায়খ বাড়ীর পথ ধরলেন ধীরপদে, অধোবদনে গভীরভাবে যিকরে মশগুল অবস্থায়। মহামতি শায়খ সারাটা রাত সুখস্বপ্নে বিভোর থাকলেন। তিনি স্বপ্নে নিজকে জান্নাতের ফুলবাগিচায় অসংখ্য হূরপরীবেষ্টিত অবস্থায় দেখলেন। তাদের মধ্যে লাজুকলতার মতো আজকের গোধূলীলগ্নের সেই কামনাময়ী তন্বী বধুটিকেও দেখতে পেলেন। 


আনন্দের আতিশয্যে শায়খ ফজরের কিছু আগে-ভাগেই উঠে পড়লেন। অতঃপর ফজর ছালাত শেষে ‘ইস্তেখারা’য় মগ্ন হ’লেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভিন্ন লক্ষণ-প্রমাণের সাহায্যে তিনি পরিস্কার বুঝে নিলেন যে, এ বিয়ে তিনি নিঃসংকোচেই করতে পারেন। 


যথাসময়ে বিবাহকার্য সম্পন্ন হ’ল। ওয়াদামত তালাকও হয়ে গেল। কিন্তু আব্দুত তাউয়াবের স্ত্রী শায়খ নাঈমের মনে এক অনির্বচনীয় সুখানুভূতির স্থায়ী স্বাক্ষর রেখে গেল। তাঁর সমস্ত শিরা-উপশিরায় যেন আগুন ধরে গেল। ঐ সুন্দরী বধুটি হূরের বেশে প্রায়ই তাঁর সঙ্গে মোলাকাত করে, হাসি-ঠাট্টা করে, গল্প-গুজব করে। ফলে রাতটা শায়খের একভাবে কাটলেও সারাটা দিন তার দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনায় অতিবাহিত হ’তে থাকে। 


কখনও শায়খ ভাবেন যে, এই স্বপ্নের পশ্চাতে হয়তবা অদৃশ্য কোন বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে। আবার ভাবেন হ’তে পারে এসব শয়তানী কারসাজি। এমনিতরো ভাবনা-চিন্তার মাঝে একদিন দুপুরে তন্দ্রাবস্থায় তিনি গায়েবী নির্দেশ পেলেন- ‘শান্ত হও নাঈম। তোমার উপর শয়তানের কোন ক্ষমতা নেই। তুমি যে তরীকা তোমার জন্য বেছে নিয়েছ, সেই তরীকার উপরে কায়েম থাকো এবং এই পথে যথাসাধ্য নেককাজ করে যাও’। 


এই ‘ইলহাম’ পাওয়ার সাথে সাথে শায়খ নাঈম ‘আল-হামদুলিল্লা-হ’ বলে উঠে বসলেন। তাঁর চেহারা খুশীতে ঝলমল করে উঠলো। 


আব্দুত তাউয়াবের স্ত্রীকে হালাল করে দেওয়ার ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে এই ধরনের তালাকদাতা স্বামীরা চারদিক থেকে এসে শায়খের নিকট ভিড় করতে লাগলো। কেননা তাদের দৃষ্টিতে মহামান্য শায়খই এ ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত ব্যক্তি। শায়খও কোন পাণিপ্রার্থিনীকে নিরাশ করতেন না। কেননা তাঁর বিশ্বাস যে, তিনি একাজ করছেন স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি হাছিলের জন্য এবং আল্লাহর বান্দাদের উপকার করবার জন্য। তাছাড়া এমন একটি মহান খিদমত হ’তে তিনি কেমনে দূরে থাকতে পারেন, যার দ্বারা দাম্পত্য বন্ধন পুনঃস্থাপিত হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসার সূত্রসমূহ পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়। 


এইভাবে সময় অতিবাহিত হয়। শায়খ নাঈম একটি মহিলাকে তালাক দেন। সাথে সাথে আরেকটি মহিলার পাণি গ্রহণ করেন। ফলে তাঁর প্রতিটি রাতই হয় বাসর রাত। নিত্য নতুন রঙের ঢেউ খেলে যায় তাঁর মনে। যা ইতিপূর্বে কখনই তিনি অনুভব করেননি। 


শায়খ এখন রাস্তায় চলেন সুন্দর ভঙ্গিতে। দাড়িগুলিকে ‘খেযাব’ দিয়ে ঝকঝকে করেছেন। পাগড়ীটার উপরি অংশ ঝান্ডার মত খাড়া করে রাখেন। সুন্নত পালনার্থ সর্বদা আতর মেখে চলেন। কথার মধ্যে বেশ হাস্যরস মিশিয়ে বলেন। কেননা মুমিনকে যে সব সময় খোশমেযাজ থাকতে হয়। 


একদিন বিকালে মহামান্য শায়খ তাঁর ঘরের আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে নদীতে পানি নিতে আসা মহিলাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এমন সময় একটি যুবক সেখানে উপস্থিত হ’ল। সঙ্গে একজন মহিলা। যুবকটি কোন এক বন্দর এলাকার হবে। হালকা-পাতলা গড়নের কুৎসিত এই যুবকটির চেহারায় প্রকাশ পাচ্ছিল যে, সে একজন সমাজ ছাড়া নচ্ছার ব্যক্তি। যাদের কাছ থেকে ঘরের শান্তি ও পারিবারিক শৃংখলা কামনা করা যায় না। 


যুবকটি শায়খের নিকটে এসে গদগদচিত্তে আকণ্ঠ ভক্তি মিশিয়ে বলে উঠলো, ‘হে আমাদের সাইয়েদ (নেতা)! আপনার খাদেম ‘তেহামী’ হাযির’। শায়খ মুচকি হেসে বললেন, ‘হয়েছে, হয়েছে আফেন্দী। এখন বলো তোমার কি ব্যাপার’? 

যুবকটি সংক্ষেপে যা বলল তার মর্ম দাঁড়ায় এই যে, সে তার স্ত্রীকে একসঙ্গে তিন তালাক দিয়ে ফেলেছে। এক্ষণে স্ত্রী ফক্বীহদের ফৎওয়া না শোনা পর্যন্ত তার সঙ্গে বসবাস করতে চায় না। ওদিকে সকল ফক্বীহ বলছেন যে, অন্য কোন পুরুষের সঙ্গে বিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত সে আমার ঘর করতে পারবে না। অতএব একমাত্র এ কারণেই এই অবেলায় হুযূরের দরবারে আসা…’। 

শায়খ ঘটনাটি শোনার সাথে সাথেই এই মহান খিদমত নজাম দিবার জন্য নিজকে সদা প্রস্ত্তত বলে ঘোষণা করলেন। যুবকটি খুশী হয়ে স্ত্রী ছাবিহাকে শায়খের ঝুপড়িতে রেখে চলে গেল।


2 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন