মুসলমানদের ভারত বিজয়
ইসলাম ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। ২০১১ (দুহাজার এগারো ) সনের গণনা ( Census) অনুযায়ী ভারতে মুসলমান সংখ্যা সতের কোটি ২২ লক্ষ। যা মোট জন সংখ্যার ১৪.২৩ % । ভারতীয় ইতিহাস , ঐতিহ্য ,শিল্প , সাহিত্য, সংগীত , স্থাপত্য ,রাজনীতি , অর্থনীতি ,খাদ্য অভ্যাস, পোশাক পরিচ্ছদ, সমাজ , সভ্যতার প্রতিটি দিকে ইসলাম ও মুসলমানের অবদান অনিস্বীকার্য। নিত্য দিনের জীবন সংগ্রামে, ধর্ম, বর্ণ , বিভেদের বাধা দূরে ঠেলে – বন্ধুত্ব ও ভ্রাত্বিত্বের পথে হাজার বছরের সরব উপস্থিতি নিয়ে – ইসলাম ও মুসলমান হয়েছে – ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ । ভারতে ইসলাম ও মুসলিম শাসনের ইতিহাস আলোচনায় আরব , ইরান , টার্কিশ , আফগান , মধ্যে এশিয়ান , হাবশী আফ্রিকান ,এবং তুর্কিশদের সাথে আসা ইউরোপিয়ানদের কথাও এসে পড়ে। এই বিষয় গুলি ইতিহাসে – বিভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। মুসলিম আগমন ভারতকে স্থায়ী ভাবে ভিতর থেকে নুতন রংগে রাঙিয়েছে। এ সত্য সবাই মানেন । ইতিহাস থেকেই জানা যায় – সুদূর অতীত- থেকেই আরবের সাথে -ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল।
প্রাকৃতিক , ভৌগোলিক এবং অর্থনৌতিক কারণে বাণিজ্য ছিল তৎকালীন মধ্যে প্রাচ্যের আরব দেশগুলির জীবন জীবিকার অন্যতম উৎস। স্থল এবং নৌ পথে এশিয়া , ইউরোপ , আফ্রিকাতে এই বাণিজ্য বিসতৃত ছিল। ধূসর মরুর কঠিন জীবন- আরবদের বেদুইন ও ব্যাবসায়ী বানিয়েছে। জীবন ও জীবিকায় আরব বৈশিষ্ট্যর এই মাহাত্ম প্রকাশে কবিতার মাঝে কেউ লিখেছেন – ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন – অথবা পাল তুলে দাও , ঝান্ডা উড়াও সিন্দাবাদ। সাহসী ও মেধা যুক্ত এ দুটি জীবন ধারাই ঝুঁকি পূর্ণ, পরিশ্রমী,ও কঠোর। ভারতে ইসলাম ও মুসলিম নিয়ে যে কোন আলোচনার পটভূমিতে তুর্কি , ইরানি , আফগানী , মধ্যে এশিয়ান সহ- অন্যান্য সবার আগে -প্রথমেই আরবদের কথা আসবে । তাই পূর্ণাঙ্গ , পরিষ্কার ধারণা পেতে আরব চরিত্রের গুরুত্ব পূর্ণ দিক গুলি জেনে রাখা প্রয়োজন।।
হজরত মুহাম্মদ ( স: ) এর জীবদ্দশাতেই সাহাবী মালিক ইবনে দিনার ২০ জন সঙ্গী নিয়ে ইসলাম প্রচারে ভারত আসেন। ৬২৯- সনে ভারতের কেরালাতে চেরামান জুম্মা মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় সমসাময়িক কালে গুজরাট এবং বাংলার মুসলিমেরা ও মসজিদ প্রতিষ্ঠিত করে ছিলেন । ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারে – সাহাবী , ওলী আল্লাহ ,গাউস , কুতুব , আউলিয়া, ছুফি, পীর, মাশায়েখ , মৌলানা , মৌলবী , তানজিম , তাবলীগ এর সৎ , নিষ্ঠাবান , জ্ঞানী,গুণী ত্যাগী ইসলাম প্রচারক দের ভূমিকা সব সময়ই মূল ও প্রধান। তবে এটাও সত্য – পরবর্তীতে ভারতে মুসলিম শাসন ইসলাম ধর্ম প্রচারে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে ।
ইসলামের প্রাথমিক যুগেই মুসলিম ধর্ম প্রচারকেরা সারা বিশ্বে ইসলাম প্রচারে ছড়িয়ে পড়েন। ওই একই সময় তারা ভারত , শ্রীলংকা , আফগানিস্তানেও ইসলামের বাণী নিয়ে আসেন। এবং এই অঞ্চলের মানুষকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেন। ভারতে সব ধর্মের, সর্ব শ্রেণীর সর্ব পেশার মানুষ -বৌদ্ধ , হিন্দু ,জৌন , দলিত ,বর্ণভেদে ইসলামের শান্তি ও সাম্যের বাণীকে উদার ভাবে গ্রহণ করেন। প্রথম যুগের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ কারীদের মাঝে যেমন সাধারণ জনগণ ছিলেন তেমনি ছিলেন উচ্চ বর্ণ শ্রেণীর মানুষও ।
৭১০ সালে মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারত অভিযানে আসেন এবং সিন্ধ ও মুলতান জয় করেন । এই অভিযানটি ৬২৯ সনে ভারতে চেরামান জুম্মা মসজিদ প্রতিষ্ঠার প্রায় ১০০ বছর পরের ঘটনা । মুহাম্মদ বিন কাসিমের ভারত অভিযানের পটভূমিতে যে বিষয় গুলি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে – তার মাঝে অন্যতম ,নব দীক্ষিত মুসলমানদের উপর স্থানীয় শাসক কুলের হয়রানি , জুলুম , অত্যাচার । শ্রীলংকা থেকে হজ্জের উদ্দেশে স্ব -পরিবারে আরব গামী কিছু মুসলিম কে যাত্রা পথে সিন্ধু অঞ্চলে বল পূর্বক অপহরণ। অপহৃতদের উদ্ধারে – এবং নৌ পথের নিরাপত্তা রক্ষায় বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোন ‘এ্যাকশন’ না নেওয়া – পলাতক কিছু রাজ্দ্রোহী , ফিতনা সৃষ্টি কারীদের ভারতে আশ্রয় প্রদান ইত্যাদি ।
ইরাকের তৎকালীন গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ (উমাইদ খলিফা – ওলীদের আমলে। ) মুসলমানদের জীবনের নিরাপত্তা , বাণিজ্য পথের নিরাপত্তা , জল দস্যু দমন , অপহৃত নারী , শিশু ,উদ্ধার , সহ পলাতক বিদ্রোহীদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করাবার উদ্দেশে মুহাম্মদ বিন কাসিম কে ভারত অভিযানের অনুমতি দেন।
এই অভিযানে যুদ্ধ ময়দানেই রাজা দাহির পরাজিত ও নিহত হন। মুহাম্মদ বিন কাসিম এর ভারত অভিযান – ভারতে -মুসলিম শাসনের ইতিহাস আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সিন্ধু বিজয় কে ভারতে হাজার বছরের মুসলিম শাসনের ভিত্তি হিসাবে ধরা যায়।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে , মুহাম্মদ বিন কাসিম সিরাজ থেকে ভারত অভিযানে রওনা হন। সম্পর্কের দিক থেকে তিনি ছিলেন ইরাকের তৎকালীন গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এর জামাতা। আপন চাচা ও শশুর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এর বড় মেয়ে জুবাইদার সঙ্গে ভারত অভিযানের মাত্র কিছু দিন আগে মুহাম্মদ বিন কাসিম এর বিয়ে হয়। সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের পর তিনি ইরাক ফিরে যান। মোহাম্মদ বিন কাসিম সমর ইতিহাসে এক প্রতিভাবান বিস্ময়। একাধারে নির্ভিক , সাহসী , কুশলী যোদ্ধা , দক্ষ শাসক ও সফল নেতা। ( ক্ষণ জন্মা এই বীর মাত্র বিশ বছর বয়সে ইহকাল ত্যাগ করেন। )
ভারতের মুসলিম শাসন কে আমরা দুই ভাগে -দুই রূপে পরিচালিত হতে দেখতে পাই। এক দিল্লি থেকে পরিচালিত সর্ব ভারতীয় শাসন।
দুই – বিভিন্ন অঞ্চল বা রাজ্যে দিল্লির গভর্নর / সুবেদার দ্বারা অথবা স্বাধীন সুলতান বা নবাব দের দ্বারা পরিচালিত শাসন ।
( বাংলার স্বাধীন নবাব শাসন , দক্ষিনাত্ত্ব সুলতান শাসন, বিজাপুর সুলতান শাসন, গোলকোনদ সুলতান শাসন , মহীশুর সুলতান শাসন -রাজ্য ভিত্তিক শাসন কর্মের উদাহরণ। )
মুসলিম শাসনে -একটি বিষয় লক্ষণীয় ও – তাৎপর্য পূর্ন তাহলো মুসলিম শাসকদের উদার – সহন শীল চরিত্র। ভারতবর্ষে হাজার বছরের মুসলিম উপস্থিতি এবং মুসলমান শাসনের সময় হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন , অগ্নি -উপাসক ধর্মের মানুষেরা সুরক্ষিত ছিলো। মুসলিম শাসকেরা কখনোই তাদের উপর জোর জবর দোস্তি করার প্রয়োজন অনুভব করেননি। ধর্ম বিষয়েও কখনো জবর দোস্তি করেননি। বরং এদেশ এবং এদেশের মানুষকে একান্ত আপন করে নিয়েছিলেন । নিজ মাতৃক্রোড় হতে জন্মানো ভাই- বোনের মত লালন পালন করেছিলেন । ব্যক্তি অথবা ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেননি । যুগ যুগ ধরে ইতিহাস সেই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে । মুসলিম শাসন কর্তাদের অনেকেই মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ , দক্ষ শাসক হিসাবে বিশ্ব ইতিহাসে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস
দিল্লি সম্ম্রাটের কেন্দ্রীয় শাসনের পাশে একই সাথে ভারতের – বিভিন্ন রাজ্যে স্বাধীন সুলতান , নিজাম , নবাবদের , ইতিহাসও গুরুত্ব পূর্ন। ইতিহাসের এ অংশ টুকুও একই ভাবে আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর। ইতিহাসের পূর্ব পর যোগ সূত্র খুঁজে নিতে এবং মুসলিম শাসনের সার্বিক গুরুত্ব অনুধাবনে এটি একটি প্রয়োজনীয় পাঠ্ । ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় থেকে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ -উদ -দৌল্লাহ পর্যন্ত । ( ভারতে রাজ্য ও বিভিন্ন অঞ্চল কেন্দ্রিক শাসনামলের মাঝ থেকে এই আলোচনায় শুধু মাত্র বাংলার শাসন আমলকেই দেখান হয়েছে ।)
১০৭০ সনে হেমন্ত সেন, বৌদ্ধ পাল রাজত্বের পর বাংলায় সেনরাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। সেনরা ছিলেন কর্ণাটকের হিন্দু ব্রাম্মন। তারা দক্ষিণ ভারত থেকে বাংলায় আসেন। রাজ্ ভাষা হিসাবে সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেন। বাংলায় পৌত্তলিক,- হিন্দু , বৌদ্ধ পাল এবং পালের পর হিন্দু সেন আমল -শেষে মুসলিম আমল শুরু হয়। ইতিহাস থেকে দেখা যায়যে যুদ্ধ জয়ের মাঝেই মূলত রাজ্য জয় হয়েছে। আর যুদ্ধে হত্যা ও ধ্বংস প্রায় সব ক্ষেত্রেই কম বেশি ঘটেছে। ইতিহাসের পথ ধরেই – ইখতার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি -১২০৪ সনে ১৭ জন অশ্বারোহী ( ঘোড় সৌনিক) নিয়ে – বাংলার রাজা লক্ষণ সেনের রাজধানী নদীয়া বিজয় করেন। যুদ্ধের আভাস পেয়ে রাজা লক্ষণ সেন নদীয়া থেকে নৌকা যোগে পূর্ব বাংলায় চলে যান ফলে বখতিয়ার খিলজি বিনা যুদ্ধেই নদীয়া জয় করেছিলেন । বখতিয়ার খলজিকে অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস এর জন্য দায়ী করেন ,বখতিয়ার খিলজি বঙ্গের নদিয়া দখল করেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের সীমানায় তিনি পা রাখেন নি- তাহলে কুমিল্লার ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার কিভাবে কে বা কারা ধ্বংস করল? এটিও ইতিহাসেরই একটি প্রশ্ন ? বৌদ্ধ পাল সম্রাজ্যের পতন হয় সেন রাজ বংশের হাত দিয়ে। সেন রাজ্ আমলে বাঙালি বৌদ্ধ এবং নিম্ন বর্ণ শ্রেণীর স্থানীয় হিন্দুরাও এক নির্যাতিত জনগোষ্ঠী ছিল, সেন বংশীয় হিন্দু রাজাদের অত্যাচারে কিছু বাঙালি বৌদ্ধ নেপাল,তিব্বত , মিয়ানমার, শ্রীলংকার দিকে পালিয়ে যান। ওই সময় তাদের হাত দিয়েই বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ নেপাল ভুটান , তিব্বত , সিকিমের দিকে ছড়িয়ে যায় । বৌদ্ধদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। এবং তারা সময়ের সাথে – কালে কালে বাঙালি মুসলিমে পরিণত হন। সময়ের ব্যবধানে বৌদ্ধ মেজরিটি বাংলা, মুসলিম মেজরিটি বাংলায় পরিণত হয়। পরিবর্তনের এই হাওয়া অনেকে সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেননি। কিছু বৌদ্ধ বুদ্ধের অহিংস বাণীর বিপরীতে মুসলমানদের প্রতি বিরূপ হন। প্রকৃত পক্ষে ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি বৌদ্ধদের সাথে বাঙালি মুসলিমদের কোন বিরোধ না থাকলেও মগদের সাথে / বার্মিজ বৌদ্ধদের সাথে বঙ্গের লোকদের নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে, মগরা পর্তুগিজদের মত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এসে লুন্ঠন করতো, মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে দাস হিসাবে বিক্রি করে দিতো। বাংলায় বার্মিজ বৌদ্ধ মগ , খ্রিস্টান পূর্তগীজ জল দস্যু , মারাঠি বর্গী দের – আক্রমণ , হত্যা , লুন্ঠন, অত্যাচার , নির্যাতনের বিরুদ্ধে – সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা বিধানে মুসলিম শাসক নবাবেরা সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন।
