ইসরাইলের লুকোচুরি:
আজ পর্যন্ত যতগুলো দেশ পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হয়েছে তাদের প্রত্যেকেই পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। কিন্তু পারমাণবিক পরীক্ষা ছাড়া ইসরাইল পরমাণু শক্তিধর হলো কিভাবে? প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্রান্স ও ইসরাইলের মধ্যে যে ধরনের পারমাণবিক সহযোগিতা ছিল তাতে পারমাণবিক ডিভাইস পরীক্ষা করার প্রয়োজন ছিল না। ফ্রান্স ও ইসরাইলের মধ্যকার সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ছিল মূলত প্লুটোনিয়ামের উন্নয়ন। তবে এ বাস্তবতা সত্ত্বেও ইসরাইল বোমা নির্মাণোপযোগী প্রচুর ইউরেনিয়াম মজুদ করেছিল। ইউরেনিয়ামের সাহায্যে তৈরি পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। একটি বিশ্বস্ত সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ১৯৬০ সালে ফ্রান্সের পরমাণু পরীক্ষার মাধ্যমে একটি নয়, দু’টি পারমাণবিক শক্তির জন্ম হয়েছিল। একটি ছিল ফ্রান্স নিজে এবং আরেকটি ইসরাইল। ফ্রান্সের পরমাণু পরীক্ষাকালে বেশ কয়েকজন ইসরাইলি পর্যবেক্ষক ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
ফ্রান্স একসময় ইসরাইলকে সহায়তা প্রদান বন্ধ করে দেয়। এরপর ইসরাইল নিজের পথ নিজেই দেখে। যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও চীন- এ পাঁচটি দেশের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার অ্যাপোলোতে ছিল ‘নিউক্লিয়ার মেটেরিয়ালস এন্ড ইকুয়িপমেন্ট কর্পোরেশন’ (নুমেক) নামে একটি ক্ষুদ্র জ্বালানি রড ফেব্রিকেশন প্ল্যান্ট। ১৯৬৫ সালে মার্কিন সরকার এ কর্পোরেশনের সভাপতি ড. জালম্যান শাপিরোকে অতি সমৃদ্ধ ২০০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম খোয়া যাবার জন্য অভিযুক্ত করে। মার্কিন আণবিক শক্তি কমিশন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ও অন্যান্য সরকারি সংস্থা ঘটনাটি তদন্ত করে। কিন্তু তদন্তে কি পাওয়া গেলো তা কেউ প্রকাশ করেনি। অনেকেই বিশ্বাস করেন, ১৯৬৫ সালের কোনো এক সময় ইসরাইল এ ২০০ পাউন্ডের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম লাভ করেছিল। কোনো কোনো সূত্র জানিয়েছে, মোসাদ এজেন্ট রাতি আইতান ও জোনাথন পোলার্ড এ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইসরাইলে পাচার করেছিলেন।
অপারেশন প্লামবাট:
১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর ফ্রান্স ইসরাইলকে ইউরেনিয়াম সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। সাবেক ফরাসি ঔপনিবেশ গ্যাবন, নাইজার ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র থেকে এ ইউরেনিয়াম সরবরাহ পাঠানো হতো। নেগেভে ফসফেট খনি থেকে ইসরাইল সামান্য পরিমাণ ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করেছিল। আর্জেন্টিনা ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করা হয়। একটি গোপন অভিযানের মাধ্যমে ইসরাইল ‘ইয়েলো কেক’ হিসাবে পরিচিত ইউরেনিয়াম অক্সাইড সংগ্রহ করেছিল। একটি জার্মান কোম্পানি এবং ভূমধ্যসাগরে একটির পর একটি জাহাজ পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা ২শ’ টন ইয়েলো কেক সংগ্রহ করে। পাচারকারীরা ৫৬০ টন ওজনের তেলের ড্রামের গায়ে ‘প্লামবাট’ শব্দটি এঁটে দেয়। ‘প্লামবাট’ মানে সীসা। অর্থাৎ তেলের ড্রামে ‘সীসা’ বহন করা হচ্ছে। জার্মান সরকার ইসরাইলের কাছে ইউরেনিয়াম পাচারে সরাসরি জড়িত ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আরবদের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে দেশটি এ কথা কখনো প্রকাশ করেনি।
প্রেসিডেন্ট নাসেরের ভুল:
১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের আগে ও পরে মিসর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে পারমাণবিক বোমা লাভে ব্যর্থ প্রয়াস চালায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন আশানুরূপ পারমাণবিক ছত্রচ্ছায়া না দেয়ায় প্রেসিডেন্ট নাসের ঘোষণা করেন, মিসর তার নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি গ্রহণ করবে। ১৯৬৫ ও ১৯৬৬ সালে নাসেরের বাগাড়ম্বর এবং দিমোনা প্ল্যান্টের উপর দিয়ে মিসরীয় বিমান উড্ডয়নে সৃষ্ট উত্তেজনার ফলে ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধের শুরুতে মিসরীয় বাহিনীর দিমোনা প্রকল্পে হামলার একটি পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নাসের এ পরিকল্পনা বাতিল করে দেন। তার ধারণা ছিল যে, ইসরাইল ১৯৬৮ সালের আগে পারমাণবিক বোমা বানাতে সক্ষম হবে না। কিন্ত তার ধারণা ছিল ভুল। ইসরাইল দু’টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করার ১০ দিন পর যুদ্ধে নামে। ভূখণ্ডগত দখল সংহত করার কোনো পরিকল্পনা যদি নাসেরের থেকে থাকতো তাহলে তিনি তা করতে পারতেন ইসরাইলের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আসার আগে। ততক্ষণে নাসেরের দু’সপ্তাহ দেরি হয়ে গিয়েছিল।
ইসরাইলের পরমাণু ডকট্রিন:
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ইসরাইল এ অস্ত্র ব্যবহারের একটি ডকট্রিন বা দিকনিদের্শনাও প্রণয়ন করে। এতে উল্লেখ করা হয়, আরবগণ ইসরাইলের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা দখল করে নিলে অথবা ইসরাইলের বিমান বাহিনী ধ্বংস করে দিলে কিংবা ইসরাইলি শহরগুলোতে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক ও জীবাণু হামলা চালালে কিংবা আরবরা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে ইসরাইল পাল্টা পারমাণবিক আঘাত হানবে। ১৯৭১ সালে ইসরাইল হাই-স্পিড ইলেক্ট্রোনিক টিউব ক্রাইটন ক্রয় শুরু করে। ১৯৮০ সালে রিচার্ড স্মিথ নামে একজন আমেরিকান ৮১০ ক্রাইটন ইসরাইলে পাচার করেন। পাচার করতে গিয়ে তিনি ধরা পড়ে যান। তার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে তিনি উধাও হয়ে যান এবং তেলআবিবে গিয়ে উঠেন। ইসরাইল এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চায় এবং জানায়, চিকিৎসা গবেষণায় এ ক্রাইটন ব্যবহার করা হবে। ইসরাইল ৪৬৯ ক্রাইটন ফেরত দেয়। কিন্তু বাদবাকি ক্রাইটন অপ্রচলিত অস্ত্র পরীক্ষায় ব্যবহার করা হয়। ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জেরিকো-২ ক্ষেপণাস্ত্রের উপাদানও চুরি করা হয়। ইসরাইলের জেরিকো ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ হচ্ছে তার পারমাণবিক সামর্থ্যের প্রমাণ। কারণ জেরিকো ক্ষেপণাস্ত্র থেকে প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্র নিক্ষেপ করা সম্ভব নয়।
পরমাণু বোমা নিক্ষেপের সিদ্ধান্ত:
১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর মিসর ও সিরিয়া একযোগে ইসরাইলে হামলা চালায়। এ আকস্মিক হামলার মুখে ইসরাইলের নিয়মিত সৈন্যরাই ছিল শুধু ডিউটিতে। রিজার্ভ সৈন্যরা না থাকায় ইসরাইলের প্রতিরক্ষা লাইন ভেঙ্গে পড়ে। ৭ অক্টোবর সকাল নাগাদ গোলান মালভূমিতে ইসরাইলের কোনো কার্যকর প্রতিরোধ ছিল না। সিরীয় সৈন্যরা গোলান উপত্যকার প্রান্তসীমায় পৌঁছে যায়। এ সংকট ইসরাইলকে দ্বিতীয়বার পারমাণবিক সতর্কতার দিকে ঠেলে দেয়। আরবদের অগ্রাভিযানের মুখে ইসরাইলী প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল মোশে দায়ান ইসরাইল রাষ্ট্রের আসন্ন পতনের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী গোল্ডামায়ারকে সতর্ক করে দেন যে,’থার্ড টেম্পল’ অর্থাৎ ইসরাইল রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলিরা তাদের রাষ্ট্রকে যেমন টেম্পল বলে আখ্যয়িত করে তেমনি তাদের পারমাণবিক বোমার সাংকেতিক নামও ‘টেম্পল’। ৮ অক্টোবর রাতে প্রধানমন্ত্রী গোল্ডামায়ার ও তার মন্ত্রিসভা পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইসরাইল ২০ কিলোটন ক্ষমতাসম্পন্ন ১৩টি পারমাণবিক বোমা সংযোজন করে। কোনো কোনো সূত্র বলছে, ইসরাইল যেসব বোমা প্রস্তুত করেছিল সেগুলো ছিল সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বোমা। সিরীয় ও মিসরীয় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য ফ্যান্টম বোমারু বিমানে পারমাণবিক বোমা তোলা হয় এবং জেরিকো ক্ষেপণাস্ত্র পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করা হয়।
৯ অক্টোবর সকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে ইসরাইলের পারমাণবিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বিমানযোগে দ্রুত ইসরাইলে সামরিক সহায়তা প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয়। একইদিন ইসরাইলি বিমানগুলো সামরিক সহায়তা নিয়ে ওয়াশিংটন থেকে যাত্রা করে। ৯ অক্টোবর ইসরাইলের রিজার্ভ সৈন্যরা অগ্রবর্তী অবস্থানে ছুটে গেলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। ১১ অক্টোবর গোলানে ইসরাইলের পাল্টা হামলায় সিরীয় অগ্রযাত্রা থেমে যায়। ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ইসরাইলি সৈন্যরা সুয়েজখাল অতিক্রম করে সিনাইয়ে প্রবেশ করে এবং মিসরের থার্ড আর্মিকে ঘেরাও করে ফেলে। এ সময় পশ্চাৎভাগ অরক্ষিত হয়ে পড়ায় ইসরাইলি সৈন্যরা সুয়েজ খালের পূর্ব তীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার মুখোমুখী হয়। ১৪ অক্টোবর প্রথম মার্কিন বিমান সাহায্য নিয়ে এসে হাজির হয়। আমেরিকার তৈরি ট্যাংক বিধ্বংসী টিওডব্লিউ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ গ্রহণে ইসরাইলি কমান্ডোরা যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার ফোর্ট বেনিংয়ে ছুটে যায়। গোলানে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য এসব ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে তারা মার্কিন সি-১৩০ হারকিউলিস বিমানে ফিরে আসে। মার্কিন কমান্ডাররা তদানীন্তন পশ্চিম জার্মানির ঘাঁটিতে মজুদ ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার নিঃশেষ করে ইসরাইলে পাঠান। মার্কিন সামরিক সহায়তা প্রদানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তদানীন্তন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জার মিসরীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সা’দাতকে বলেছিলেন, ইসরাইল পারমাণবিক হামলা শুরু করার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। তাই তাকে পারমাণবিক হামলা থেকে বিরত রাখার জন্য প্রচলিত সামরিক সহায়তা দেয়া হয়।
সোভিয়েত হুমকি:
আরব-ইসরাইল যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল খুবই অস্পষ্ট। ১৮ অথবা ২৩ অক্টোবর একটি সোভিয়েত যুদ্ধজাহাজ মিসরের আলেকজান্দিয়া বন্দরে এসে নোঙ্গর ফেলে। নভেম্বরের শেষ নাগাদ জাহাজটি এ বন্দরে অবস্থান করে। কিন্তু কোনো সমরাস্ত্র খালাস করা হয় নি। সন্দেহ নেই, আরবদের প্রতি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিশ্রুতি রক্ষার স্বার্থে এবং ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়ার জন্যই এ জাহাজ এসেছিল। ২৪ অক্টোবর সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিউনিদ ব্রেঝনেভ সুয়েজ খালের পূর্ব তীরে বিচ্ছিন্ন মিসরীয় সৈন্যদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য সোভিয়েত ছত্রী সেনা পাঠানোর হুমকি দেন এবং সাতটি সোভিয়েত ছত্রী ডিভিশনকে সতর্কতাবস্থায় থাকার নির্দেশ দেন। পরে প্রমাণ পাওয়া গেছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত সাবমেরিনও পাঠিয়েছিল। মিসরে সোভিয়েত পারমাণবিক উপস্থিতির জবাবে পরের দিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন বিশ্বব্যাপী মার্কিন স্থাপনায় পারমাণবিক সতর্কতা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ইসরাইলে তৃতীয়বারের মতো পারমাণবিক সতর্কতা ঘোষণা করা হয়। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডামায়ার যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলে এ সংকট কেটে যায়।
ইসরাইলের পরমাণু পরীক্ষা:
একটি প্রশ্ন জাগা খুবই স্বাভাবিক যে, ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে থাকলে বিস্ফোরণ ঘটালো না কেন? কয়েকভাবে এ প্রশ্নের জবাব দেয়া যায়। প্রথমত, পুরনো পদ্ধতিতে সংযোজিত পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় না। গবেষকগণ পরমাণু অস্ত্রের উপকরণগুলো আলাদা আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে পারেন এবং ব্যাপকভাবে কম্পিউটারেও এ পরীক্ষা করা যায়। ১৯৬০ সালে ফ্রান্স যে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল ইসরাইল তা থেকে পর্যাপ্ত তথ্য পেয়েছিল। তাছাড়া, পঞ্চাশ ও ষাট দশকে যুক্তরাষ্ট্র যেসব পরমাণু পরীক্ষা চালিয়েছিল, সেগুলো থেকেও ইসরাইলের তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল অবারিত। শুধু তাই নয়, ভূগর্ভে পারমাণবিক পরীক্ষা চালালেও তা শনাক্ত করা কঠিন। সাবেক পশ্চিম জার্মানির আর্মি ম্যাগাজিন ‘ওয়ারটেকনিক’ ১৯৭৬ সালে এক রিপোর্টে জানিয়েছিল, ১৯৬৩ সালে নেগেভে ইসরাইল পরমাণু পরীক্ষা চালায়। অন্যান্য সূত্র জানায়, ১৯৬৬ সালে নেগেভের আল-নকিব-এ ইসরাইল পরমাণু পরীক্ষা চালিয়েছে। মার্কিন উপগ্রহে ১৯৭৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ভারত মহাসাগরে একটি উজ্জ্বল আভা ধরা পড়ে। ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়, এ আভা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইসরাইলের যৌথ পারমাণবিক বিস্ফোরণের দৃশ্য। মার্কিন উপগ্রহে যে দৃশ্যটি ধরা পড়ে তা ছিল তৃতীয় পরমাণু বিস্ফোরণের। তবে প্রথম দু’টি বিস্ফোরণের দৃশ্য ধরা পড়ে নি। কারণ তখন আকাশ ছিল মেঘা”ছন্ন। দুর্ঘটনাক্রমে তৃতীয় বিস্ফোরণের দৃশ্যটি ধরা পড়ে যায়। কারণ তখন আকাশ ছিল মেঘমুক্ত। ১৯৯৮ সালের জুনে ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটের একজন সদস্য সে বছরের ২৮ মে আইলাতের কাছে ভূগর্ভে পরমাণু বিস্ফোরণের জন্য সরকারকে অভিযুক্ত করেন। মিসরও একই ধরনের অভিযোগ করেছিল।
ইরাকী পরমাণু স্থাপনায় হামলা:
ইসরাইল শুধু আমেরিকার পরমাণু বোমা তৈরির উপাত্ত সংগ্রহেই আগ্রহী ছিল তা নয়, তারা আমেরিকার গোয়েন্দা তথ্য লাভেও ছিল তৎপর। ইসরাইলিরা দেখতে পায়, তারা সোভিয়েত ইউনিয়নেরও টার্গেট। আমেরিকান বংশোদ্ভূত ইসরাইলি গোয়েন্দা জোনাথন পোলার্ড মার্কিন উপগ্রহে তোলা সোভিয়েত ইউনিয়নের উপাত্ত সংগ্রহ করেন। এ উপাত্ত পেয়ে ইসরাইল সোভিয়েত শহরগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে। এ থেকে এটাই বুঝা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রতিশোধমূলক হামলা চালানোর ইচ্ছাও ইসরাইল পোষণ করতো। ইসরাইল ১৯৮১ সালের ৭ জুন ইরাকের ওসিরাকে তামুজ-১ রিঅ্যাক্টরে ঝটিকা হামলা চালায়। এ হামলায় ইসরাইল মার্কিন উপগ্রহে তোলা ছবি ব্যবহার করে। ইরাকের ওসিরাক প্ল্যান্টে হামলায় ৮টি এফ-১৬ ও ৬টি এফ-১৫ অংশগ্রহণ করে। দুই হাজার পাউন্ডের ১৫টি বোমা নিক্ষেপ করা হয়। ষোড়শ বোমাটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিকটবর্তী একটি হলে গিয়ে পড়ে। পৃথিবীতে এটাই ছিল কোনো রিঅ্যাক্টরের উপর বহিঃশক্তির প্রথম হামলা।
ইসরাইল পরমাণু অস্ত্রের জোরে আরবদের বিরুদ্ধে অন্তত দু’টি যুদ্ধে জয়লাভ করেছে, ইরাকের পরমাণু স্থাপনা উড়িয়ে দিয়েছে। তার পরমাণু খায়েশের উপায় ও উপকরণ যুগিয়েছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তা আমেরিকা, ফ্রান্স, নরওয়ে, বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানি প্রভৃতি দেশ যারা নিজের বেলায় ষোল আনা আর পরের বেলায় “আহা আহা মানবতা, গনতন্ত্র” বলে গলা ফাটায়। এসব দেশের সহায়তায় ক্ষুদ্র সন্ত্রাসী দেশ ইসরাইল পরাক্রমশালী পরমাণু শক্তির অধিকারী।
যদি অন্যান্য দেশের পরমাণু অস্ত্র রাখা মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড হয়, তাহলে আমেরিকা, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি, ভারত, পাকিস্তান পরমাণু অস্ত্র মজুদ রাখে কোন যুক্তিতে বা কোন মানবতার উপকারে?
