ইয়ারমূক যুদ্ধ

 


ইয়ারমূক যুদ্ধ


ভূমিকা: ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের  সেপ্টেম্বর মাসে আজকের সিরিয়ার সীমান্তবর্তী ইয়ারমূকের ময়দানে মুসলিম ও খ্রিষ্টান  বাহিনীর মধ্যে ছয়দিনের এক সিদ্ধান্তকারী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। যাতে মুসলিম বাহিনী  ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে। যার ফলে এতদঞ্চল থেকে রোমক শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং  ইসলামী শাসনের সূচনা হয়। সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তীন, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ  এলাকা ইসলামী খেলাফতের অধীনস্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে এই সমস্ত এলাকার সকল নাগরিক  ইসলামী সাম্য ও ন্যায়বিচারে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম কবুল করে। অদ্যাবধি এতদঞ্চলের সবাই  মুসলিম।

সৃষ্টির প্রতি সৃষ্টির দাসত্বকে উৎখাত করে স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির দাসত্ব  কায়েম করতে, বাতিলকে পরাভূত করে হককে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং দুনিয়াতে যালিমকে পদানত  করে ন্যায়-ইনছাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইসলামের জিহাদ সমূহ সংঘটিত হয়।  মানবতার নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ও পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে ছাহাবীগণ  নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন। ঈমানী দৃঢ়তা ও আল্লাহ্র  প্রতি অকৃত্রিম নির্ভরশীলতার কারণে এসব যুদ্ধে তাঁরা বিজয় লাভ করেছেন। ইয়ারমূক  তেমনি এক ঐতিহাসিক মহাযুদ্ধের নাম।

আবুবকর (রাঃ)-এর খেলাফতকালের (১১-১৩ হিঃ) শেষদিকে রোম বিজয়ের সূচনা হয় এবং ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালের (১৩-২৩ হিঃ) শুরুর  দিকেই এ বিজয় সম্পন্ন হয়। ইয়ারমূক ছিল অন্যতম এক মহাসমর, যা ইসলামী খেলাফত ও রোম  সম্রাট তথা বাইজেন্টাইন খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল।


ইয়ারমূকের পরিচয়: ইয়ারমূক একটি উপত্যকার নাম। যা ইয়ারমূক নদীর  তীরে অবস্থিত। ইয়ারমূক একটি নদী যার উৎপত্তি হয়েছে হাওরান পাহাড় থেকে। এটি সিরিয়া  ও ফিলিস্তীন সীমান্তের কোল ঘেঁষে দক্ষিণে জর্দানের নিম্নভূমিতে পতিত হয়ে মৃত সাগরে  গিয়ে মিলিত হয়েছে। জর্দান নদীতে পতিত হওয়ার পূর্বে ৪৩ কি.মি. দূরত্বের একটি  প্রশস্ত উপত্যকা রয়েছে যার তিন দিকে উঁচু উঁচু পাহাড় বেষ্টিত। আর একদিক তথা বাম  দিক ফাঁকা ময়দান, যেখানে ইয়ারমূক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রোমক সৈন্যরা এ প্রশস্ত স্থানে  অবস্থান গ্রহণ করে, যা তাদের বিশাল সেনাবাহিনীর জন্য উপযুক্ত ছিল। অপরপক্ষে মুসলমানগণ  দক্ষিণে তিন পাহাড় বেষ্টিত প্রশস্ত স্থান থেকে বেরুবার পথে অবস্থান গ্রহণ করেন। এর  ফলে রোমক সৈন্যদের বের হওয়ার একমাত্র রাস্তাটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে তাদের পিছু হটার  বা পালাবার কোন পথ অবশিষ্ট ছিল না।


সময়কাল: ৫ই রজব ১৩ হিজরী মোতাবেক ২রা সেপ্টেম্বর ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে  এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলমানদের সেনাপতি ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) ও রোমকদের সেনাপ্রধান ছিল মাহান বা বাহান।


সৈন্যসংখ্যা: রোমকদের  সৈন্য সংখ্যা ছিল দুই লক্ষ চল্লিশ হাযার। আশি হাযার অগ্রগামী সৈন্য, যাদের মধ্যে চল্লিশ  হাযার মৃত্যুর জন্য শিকল পরিহিত এবং চল্লিশ হাযার মাথায় পাগড়ী পরিহিত, আশি হাযার  পদাতিক ও আশি হাযার অশ্বারোহী। অপরদিকে মুসলমান সৈন্যের মধ্যে সাতাশ হাযার আগে  থেকে সেখানে অবস্থান করছিল। পরে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) ইরাক থেকে নয় হাযার সৈন্য  সহ সেখানে গিয়ে যোগদান করলে সর্বসাকুল্যে মুসলিম সৈন্য দাঁড়ায় ৩৬ হাযারে। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেন, মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল  চল্লিশ হাযার। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর এক হাযার ছাহাবী এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।  যাদের মধ্যে বদরী ছাহাবী ছিলেন একশত জন।


ঘটনাপ্রবাহ: হযরত আবুবকর (রাঃ) সিরিয়া অভিযানে খালিদ বিন সাঈদ (রাঃ)-এর  নেতৃত্বে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু তারা পরাজিত হয়ে ফিরে আসে। এতে খলীফার  সিরিয়া বিজয়ের আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায় এবং বিশাল সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত বাহিনী নিয়ে  তা বিজয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। আমর ইবনুল আছ (রাঃ)-কে একটি ব্যাটালিয়ন গঠন করে  ফিলিস্তীনের পথে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দেন। ইয়াযীদ বিন আবু সুফিয়ানকে তলব করে তাকে  একটি ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব দিলেন। যাদের মধ্যে সুহায়েল বিন আমর (রাঃ) সহ মক্কার বড়  বড় যোদ্ধারা ছিলেন। তার সাথে তার ভাই মু‘আবিয়ার নেতৃত্বে আরো কিছু সৈন্যের সমাবেশ  ঘটালেন। অপর দিকে খালিদ বিন সাঈদের সাথে থাকা সৈন্যের নেতৃত্ব দানের দায়িত্ব অর্পণ  করলেন শুরাহবীল ইবনু হাসানাহ-এর উপর। অন্যদিকে এক বিশাল বাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়ে তার  দায়িত্ব দিলেন আবু ওবায়দা ইবনুল জার্রাহ (রাঃ)-এর উপর। তিনি প্রত্যেক বাহিনীর জন্য  নির্দিষ্ট পথ বাতলিয়ে দিয়ে সে পথে চলার নির্দেশ প্রদান করলেন। এই নির্দেশের ফলে  আমর ইবনুল আছ ও আবু ওবায়দা ইবনুল জার্রাহ (রাঃ) আয়লা শহ্রের উপরদিয়ে মু‘রিকার পথ  ধরে এবং ইয়াযীদ বিন মু‘আবিয়া শুরাহবীল ইবনু হাসানাহ্কে সাথে নিয়ে তাবূকিয়ার পথ ধরে  সিরিয়া রওয়ানা হ’লেন। সেখানে পৌঁছলে আবু ওবায়দা জাবিয়ায়, ইয়াযীদ বালক্বায়, শুরাহবীল  জর্দানে এবং আমর ইবনুল আছ ইরবা নামক স্থানে অবতরণ করলেন।


রোমক সৈন্যদের প্রতি বাইজেন্টাইন সম্রাটের উপদেশ: সম্রাট হিরাক্লিয়াস  ছিলেন একজন বিজ্ঞ মানুষ। নবী করীম (ছাঃ)-এর পত্র পাওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করার ইচ্ছা  পোষণ করেন। কিন্তু তার রাজত্ব, পদ এবং সেনাবাহিনীর ভয় তাকে ইসলাম গ্রহণে বাধা দেয়।  রোমকরা মুসলমানদের উপস্থিতি টের পেয়ে সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে পত্র লিখে তাকে  অবহিত করে। তখন তিনি আল-কুদ্সে অবস্থান করছিলেন। তিনি উপদেশ দিয়ে বললেন, আমি মনে  করি, তোমরা মুসলমানদের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হবে। আল্লাহ্র কসম! তাদেরকে সিরিয়ার  অর্ধেক প্রদান করে তোমাদের জন্য রোম সহ তার অর্ধেক রেখে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া উত্তম  হবে পুরো সিরিয়া ও রোমের অর্ধেক তাদের দখলে চলে যাওয়ার চাইতে। এই উপদেশ সৈন্যদের  খুশী করতে পারল না। বরং তারা মনে করল, সম্রাট দুর্বল হয়ে পড়েছেন এবং বিজয়ী মুসলিম  যোদ্ধাদেরকে দেশ হস্তান্তর করে দিবেন। পরাজিত হওয়ার আশংকা থাকা সত্ত্বে্ও বাধ্য  হয়ে সম্রাট হিরাক্লিয়াস মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং  সৈন্যদের একত্রিত করে হিমছে পাঠালেন। সেখানে ২ লক্ষ ৪০ হাযার সৈন্যের বিশাল এক  সমাবেশ ঘটল। তাদেরকে চারটি ব্যাটালিয়নে ভাগ করা হ’ল। যাতে তারা মুসলমানদের চারটি  দলের মোকাবেলা করে তাদেরকে দুর্বল করে ফেলে   এবং মুসলমানরা তাদের অন্য ব্যাটালিয়নকে সাহায্য করার বদলে নিজেদের নিয়ে  ব্যস্ত থাকে।


মুসলমানদের যুদ্ধের প্রস্ত্ততি: রোমকদের বিশাল সৈন্যের সমাবেশ দেখে মুসলমান  সৈন্যদের মাঝে ভীতির সঞ্চার হ’লে তারা করণীয় জানতে চেয়ে আমর ইবনুল আছ (রাঃ)-এর  নিকট পত্র লিখলেন। তিনি উত্তরে বললেন, আমাদের এখন করণীয় ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আমরা সবাই  ঐক্যবদ্ধ হ’লে সৈন্যসংখ্যা কম হবার কারণে পরাজিত হব না। আমর ইবনুল আছ আবুবকর (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখে সাহায্য  চাইলে  তিনি আমর ইবনুল আছ (রাঃ)-এর মত উত্তর দিয়ে লিখলেন, ‘তোমরা তো এমনই যাদেরকে  কমসংখ্যক সৈন্য পাঠিয়ে সাহায্য করা যায় না। তোমাদেরকে অন্তত দশ হাযার সৈন্য দিয়ে সাহায্য করা হবে।  আর যদি শত্রুরা দক্ষিণ দিক থেকে আসে তাহ’লে আরো অধিক সৈন্য পাঠিয়ে সাহায্য করা  হবে। অতএব তোমরা দক্ষিণ দিকের শত্রুদের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে এবং ইয়ারমূকে গিয়ে  নিজ নিজ নেতার নেতৃত্বে মিলিত হবে এবং পাশাপাশি অবস্থান নিবে। পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না।


আবুবকর (রাঃ) আমর ইবনুল  আছের পত্রের প্রেক্ষিতে বড় বড় ছাহাবীদের নিয়ে পরামর্শ বৈঠকে বসলেন। প্রত্যেকে নিজ  নিজ বিচার-বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা অনুযায়ী পরামর্শ দিলেন। অবশেষে আবুবকর (রাঃ) বললেন,  আমি খালিদ বিন ওয়ালীদের মাধ্যমে খ্রিষ্টানদের শয়তানী কুমন্ত্রণা হ’তে মুসলমানদের  রাখব।


খলীফা আবুবকর (রাঃ) ইরাকে অবস্থানকারী সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালীদের কাছে এই মর্মে পত্র লিখলেন যে, সেখানে একজন প্রতিনিধি নিযুক্ত করে  চৌকস সৈন্যদের নিয়ে সিরিয়া চলে যাবে। খালিদ মুছান্না বিন হারেছার হাতে ইরাকের  দায়িত্ব অর্পণ করতে দ্বিধাবোধ করছিলেন। এটা বুঝতে পেরে মুছান্না বললেন, আল্লাহ্র  কসম! আমি কেবল খলীফা আবুবকর (রাঃ)-এর নির্দেশ বাস্তবায়ন করার জন্য এখানে অবস্থান  করব। আল্লাহ্র কসম! আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণ ব্যতীত অন্য কারো সাহায্যের  প্রত্যাশা করি না। এ কথা শুনে খালিদ তাকে শান্ত করলেন এবং নারী ও দুর্বল পুরুষদের  মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন। যাতে মুছান্না যুদ্ধের সময় তাদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত না  থাকেন। সেনাপতি খালিদ তার সাথে থাকা রাসূল (ছাঃ)-এর  ছাহাবীদের সহ নয় হাযার সৈন্য নিয়ে সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা হ’লেন। পাঁচ দিন পথ চলার  পর তারা ১৩ হিজরীর রবীউল আখের মাসের শেষ দিকে ইয়ারমূকে পৌঁছলেন। পথিমধ্যে তিনি  তাদাম্মুর, বাহ্রা, কারাকের ও বছরা শহ্র জয় করলেন এবং মুসলমানদের সুসংবাদ জানালেন।  এবার মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা দাঁড়াল ছত্রিশ হাযারে।


খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) ময়দানে এসে বুঝতে পারলেন  যে, মুসলমান সৈন্যরা পাঁচটি দলে বিভক্ত হয়ে পাঁচজন সেনাপতির নেতৃত্বে যুদ্ধ করবে।  তিনি এ বিষয়ে তাদের সতর্ক করে দিয়ে বললেন, এটা আল্লাহ্র দিন সমূহের অন্যতম দিন। এ  দিনে কারো অহংকার এবং স্বেচ্ছাচারিতা কাম্য নয়। তোমরা খালেছ অন্তরে জিহাদ কর।  তোমাদের আমল সমূহ দ্বারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি কামনা কর। কেননা এমন দিন আর নাও আসতে  পারে। তোমরা অন্য দলের উপর নির্ভর করে সুশৃঙ্খলভাবে কোন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে  যুদ্ধ করতে পারবে না। আর এটা বৈধ নয় এবং উচিতও নয়। আর তোমাদের পিছনে যিনি আছেন  তিনি জানতে পারলে তোমাদের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবেন। অতএব খলীফা যেভাবে  নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে কাজ কর। তারা বলল, তাহ’লে আমাদের করণীয় কী? তিনি বললেন,  সকল সৈন্য একজন নেতার নেতৃত্বে যুদ্ধ করবে। পাঁচজন সেনাপতির দায়িত্বে পাঁচ দিন  যুদ্ধ চলবে, তবে প্রতিদিন একজনের নেতৃত্বে চলবে। আর এভাবে  যুদ্ধ চলতে থাকবে। তারা খালিদ বিন ওয়ালীদ  (রাঃ)-কে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব অর্পণ করল। খালিদ বিন ওয়ালীদ তাদেরকে উৎসাহিত  করে বক্তব্য দিলেন। কারণ ইতিপূর্বে কয়েক মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। সৈন্যরা অনেকটা  হীনবল হয়ে পড়েছিল।


সৈন্য বিন্যস্তকরণ: মুসলিম সেনাপতি সৈন্যদের প্রধানত তিন ভাগে ভাগ  করলেন। যাদের নাম দিলেন ক্বালব (প্রধান), মায়মানাহ (ডান বাহু) ও মায়সারাহ (বাম বাহু)।  ক্বালব তথা প্রধান অংশের দায়িত্ব দিলেন আবু ওবায়দা ইবনুল জার্রাহ (রাঃ)-কে, ডান  বাহুর দায়িত্ব দিলেন আমর ইবনুল আছ (রাঃ)-কে এবং বাম বাহুর দায়িত্ব দিলেন ইয়াযীদ  বিন আবু সুফিয়ানকে। আর ছত্রিশ হাযার সৈন্যকে ছত্রিশটি ছোট ছোট দলে  ভাগ করলেন এবং প্রত্যেক হাযারের জন্য একজন দক্ষ সেনাপতিকে দায়িত্ব অর্পণ করলেন।  এভাবে সৈন্যরা যুদ্ধের জন্য প্রস্ত্তত হয়ে গেল। সেনাপতি খালিদ এভাবে সেনা বিন্যাসের  মাধ্যমে মুসলমানদের মন থেকে সৈন্য স্বল্পতার ভয় দূর করার চেষ্টা করলেন। তারপরেও  একজন বলে ফেলল, মুসলমানদের তুলনায় রোমকরা  কতইনা বেশী! একথা শুনে খালিদ (রাঃ) রেগে গিয়ে বললেন, মুসলমানদের তুলনায় রোমকরা  কতইনা কম? সৈন্যের আধিক্য নির্ভর করে আল্লাহ্র সাহায্য প্রাপ্তির উপর। আর সৈন্যের স্বল্পতা  বিবেচিত হবে পরাজয়ের অপমান ও গ্লানির উপর। সেনাপতি খালিদ মুসলমান  সৈন্যদের উপদেষ্টা নিয়োগ করতেও ভুলে যাননি। সৈন্যদের বিন্যস্ত করার পর আবুদ্দারদা  (রাঃ)-কে বিচারক হিসাবে, আবু সুফিয়ান (রাঃ)-কে উপদেশদাতা হিসাবে, কুবাছ ইবনু  আশয়ামকে পর্যবেক্ষক হিসাবে ও মিক্বদাদ (রাঃ)-কে জিহাদের আয়াত সমূহ পাঠকারী হিসাবে  নিয়োগ দান করলেন। ঐতিহাসিক ইবনু জারীর ত্বাবারী বলেন, বদর যুদ্ধের পর থেকে যুদ্ধের  সময় জিহাদের সূরা পাঠ করা সুন্নাত হিসাবে জারি হয়ে যায়। পরবর্তীতে লোকেরা এর উপর  অটল ছিল।


সৈন্যদের প্রতি উপদেশ: (১) আবু সুফিয়ান সৈন্যদের মাঝে হেঁটে হেঁটে  উপদেশ দিয়ে বললেন, ‘হে মুসলমানগণ! তোমরা আরব, অথচ এখন পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন  এবং আমীরুল মুমিনীন ও মুসলমানদের সাহায্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছ। আল্লাহ্র  কসম! তোমরা তো এক বিরাট সংখ্যক সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এসেছ। তাদের ক্রোধ তোমাদের  উপর খুব কঠিন হবে। কারণ তোমরা তাদেরকে, তাদের দেশ ও নারীদেরকে সঙ্গহীন করেছ।  আল্লাহ্র কসম! সত্যিকারার্থে যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও কষ্টদায়ক ভূমিতে ধৈর্যধারণ ব্যতীত  তিনি তোমাদেরকে এ জাতি হ’তে মুক্তি দান করবেন না এবং তোমরা আল্লাহ্র সন্তুষ্টিও  অর্জন করতে পারবে না। সাবধান! এটা আবশ্যকীয় সুন্নাত। জন্মভূমি তোমাদের পিছনে, আর  তোমাদের মাঝে ও আমীরুল মুমিনীন সহ মুসলিম জামা‘আতের মাঝে এক বিরাট মরুভূমি। এখানে  ধৈর্যধারণ ব্যতীত কারো জন্য কোন দুর্গ নেই, নেই কোন নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল।  আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি পূরণের আশা করাই হ’ল নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। সুতরাং তোমরা  তরবারীর মাধ্যমে এবং পরস্পরকে সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদেরকে রক্ষা কর। এটাই হবে  তোমাদের রক্ষাকবচ’। অতঃপর তিনি নারীদের কাছে গিয়ে তাদের উপদেশ দিয়ে ফিরে এসে  বললেন, হে ইসলামের অনুসারীরা! উদ্ভূত পরিস্থিতি কেমন তোমরা তা দেখছ। এটা রাসূল  (ছাঃ)-এর আনীত দ্বীন। জান্নাত তোমাদের সামনে এবং শয়তান ও জাহান্নাম তোমাদের পিছনে’।


এভাবে আবু সুফিয়ান (রাঃ) সৈন্যদের কাতারে তাঁর  নিজ স্থানে ফিরে গেলে (২) আবু হুরায়রা (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেন, হে লোক সকল!  তোমরা আনতনয়না জান্নাতের হূরের দিকে এবং জান্নাতুন নাঈমে তোমাদের রবের সান্নিধ্য  লাভের দিকে ছুটে এসো। তোমরা আজ যেখানে অবস্থান করছ, সেটা তার কাছে অনেক প্রিয়  স্থান। জেনে রেখো! ধৈর্যশীলদের জন্য বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।


অতঃপর (৩) আবূ ওবায়দাহ (রাঃ) উপদেশ দিতে গিয়ে  বলেন, ‘হে আল্লাহ্র বান্দাগণ! তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য  করবেন এবং তোমাদের পদযুগলকে দৃঢ় রাখবেন। হে মুসলিম সেনাবাহিনী! তোমরা ধৈর্যধারণ  কর। কেননা ধৈর্য কুফরী থেকে বাঁচার, আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের এবং লজ্জা নিবারণের  উপায়। তোমরা তোমাদের যুদ্ধের সারি থেকে সরে যাবে না। কাফেরদের দিকে এক ধাপও অগ্রসর  হবে না এবং আগ বেড়ে তাদের সাথে যুদ্ধের সূচনাও করবে না। শত্রুদের দিকে বর্শা তাক  করে থাকবে এবং বর্ম দিয়ে আত্মরক্ষা করবে। তোমাদেরকে যুদ্ধের নির্দেশ না দেয়া  পর্যন্ত তোমরা মনে মনে আল্লাহ্র যিকির করতে থাকবে’।


এ বক্তব্যগুলো শোনার পর মুসলমানদের মাঝে নতুন  প্রাণের সঞ্চার হ’ল। তাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা গেল। তারা জান্নাত লাভের আশায়  পাগলপারা হয়ে গেল। অনেকে উদ্দীপনামূলক কবিতা আবৃত্তি শুরু করল।


অপর দিকে খ্রিষ্টান  পাদ্রীরা একমাস ধরে তাদের সৈন্যদের উদ্দীপনামূলক বক্তব্য প্রদান করে তাদেরকে  উজ্জীবিত করেছিল। এছাড়া তাদের প্রতি দশজন সৈন্যকে এক শিকলে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল এবং  কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছিল। যাতে কেউ পালিয়ে যেতে না পারে এবং পালালেও  কাঁটাতারে গিয়ে আটকা পড়ে। ইমাম যাহাবী বলেন, রোমকরা নিজেদেরকে লোহার শিকলে এক সাথে  পাঁচ ও ছয় জন করে বেঁধেছিল যাতে তারা পলায়ন করতে না পারে। অতঃপর আল্লাহ যখন তাদেরকে  পরাস্ত করলেন, তখন তাদের এক একজন তার সাথে বাঁধা সকলকে টেনে নিয়ে ইয়ারমূক নদীতে  পড়া শুরু করল। অবশেষে তাদেরকে টেনে আনা হ’ল একটি উপত্যকায়। যেখানে পড়ে থাকা আহত  সৈন্যগুলিকে অসংখ্য ঘোড়া পদদলিত করে হত্যা করেছিল।


একটানা ছয় দিন যুদ্ধ চলল। সেনাপতি খালিদ, যুবায়ের  ইবনুল আওয়াম ও ইকরিমা বিন আবু জাহল বীর দর্পে যুদ্ধ করে বহু রোমক সৈন্য হত্যা  করলেন। হিশাম বিন উরওয়া তার পিতা হ’তে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ইয়ারমূকের দিন  মুসলমানগণ আমার পিতা যুবায়েরকে বলল, আপনি কি রুদ্রমূর্তি ধারণ করবেন না, যাতে  আপনাকে দেখে আমরাও যুদ্ধংদেহী হ’তে পারি। তখন তিনি বললেন, আমি রুদ্রমূর্তি ধারণ  করলে তোমরা আমাকে মিথ্যারোপ করবে। তারা বলল, না আমরা তা করব না। তখন তিনি শত্রুদের  উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি তাদের কাতার ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়লেন। সে সময় তার সাথে  কেউ ছিল না। অতঃপর ফিরে আসার সময় তারা তার ঘোড়ার লাগাম ধরে তার কাঁধে বদর যুদ্ধে  আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের দু’পাশে দু’টি প্রচন্ড আঘাত করল। উরওয়া বলেন, আমি ছোট থাকা  অবস্থায় ঐ ক্ষতস্থানগুলোতে আঙ্গুল ঢুকিয়ে খেলা করতাম। যুবায়ের (রাঃ) তার দশ বছরের পুত্র  আব্দুল্লাহ বিন যুবায়েরকে এ যুদ্ধে নিয়ে গিয়েছিলেন।  তিনি  তাকে   ঘোড়ায় আরোহণ করিয়ে

অন্য একজনের হাতে তার নিরাপত্তার দায়িত্ব অর্পণ  করেন।

বাকি লিখা পরের পোস্ট এ দেওয়া হয়েছে  (২)

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন