কাদেসিয়া যুদ্ধ পোস্ট (১)


 কাদেসিয়া যুদ্ধ


ভূমিকা:

বর্তমান ইরাক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। এখানে মানুষের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই।  পশ্চিমা হায়েনারা বিমান হামলা চালিয়ে হত্যা করে চলেছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে। ধ্বংস  করে যাচ্ছে হাযার হাযার বাড়ি-ঘর ও স্থাপনা। কেউ বলছে না মানবতার কথা। সাম্রাজ্যবাদীদের  স্বার্থের বলি হয়ে অকাতরে জীবন দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। পুরো জনপদকে করে তুলেছে  অশান্ত। অথচ এই ইরাকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুসলমানগণ। পারসিকদের সাথে যুদ্ধ  করে মুসলমানগণ বিজয় লাভ করেছিলেন। জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শান্তি,  নিরাপত্তা ও সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি। পারসিকদের পরাজিত করতে মুসলমানদের যে সকল যুদ্ধ  করতে হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল কাদেসিয়ার যুদ্ধ। এটা ছিল ইতিহাস পরিবর্তনকারী  এক যুদ্ধ। ইসলামের ইতিহাসে এটা ছিল সর্ববৃহৎ যুদ্ধ।


কাদেসিয়ার পরিচয়:

কাদেসিয়া কূফা নগরীর দক্ষিণে ফোরাত নদীর পূর্ব দিকে মরু উপত্যকায় অবস্থিত একটি  স্থানের নাম। এই এলাকায় যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ায় এর নাম হয় ‘কাদেসিয়া যুদ্ধ’। পারসিক  রাজা কিসরাগণ সেখানে ‘মাউল ইরাক’ নামে একটি শহর গড়ে তোলেন।


যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার সময়কাল:

কাদেসিয়া যুদ্ধ ১৫ হিজরী সনের ১৩-১৬ শা‘বান মোতাবেক ১৬ থেকে ১৯ নভেম্বর ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে সা‘দ বিন আবী  ওয়াক্কাছ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে মুসলমান ও রুস্তম ফাররাখযাদের নেতৃত্বে পারসিক খ্রিস্টানের  মধ্যে সংঘটিত হয়। তবে ইবনু কাছীর (রহঃ) তারিখ উল্লেখ ছাড়াই বলেছেন, এটা ১৪ হিজরী সনে সংঘটিত  হয়েছিল।


মুসলিম সৈন্য সংখ্যা:

এ যুদ্ধে মুসলিম সৈন্য ছিল ত্রিশ হাযার বা তার চেয়ে কিছু বেশী। পরে সিরিয়া থেকে ছয় হাযার সৈন্য এসে মুসলিম বাহিনীর সাথে যোগদান করলে  সর্বসাকুল্যে মুসলিম সৈন্য সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ছত্রিশ হাযারে। এর মধ্যে সত্তর (৭০) জনের  বেশী বদরী ছাহাবী ছিলেন। ছয়শর অধিক ছাহাবী ও তাঁদের প্রায় সাতশত সন্তান এ যুদ্ধে  অংশগ্রহণ করেন।


মুসলিম সেনাপতিবৃন্দ:

এ যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ছিলেন সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ)। যুদ্ধের কমান্ডার  ছিলেন খালিদ ইবনু আরফাতাহ (রাঃ)। ডান বাহুর সেনাপতি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু মু‘তাম  (রাঃ) ও বাম বাহুর অশ্বারোহী দলের সেনাপতি ছিলেন শুরাহবীল ইবনু সামত্ব (রাঃ)। আর পদাতিক  বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন মুগীরা ইবনু শু‘বাহ (রাঃ)। হাশেম ইবনু উতবা বিন আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) ছিলেন সিরিয়া থেকে আগত  সৈন্যদের সেনাপতি। তিনি যুদ্ধের তৃতীয় দিন ইরাকী  বাহিনীকে সাহায্যের জন্য আসেন। কা‘কা‘ ইবনু আমর তামীমী (রহঃ) তাঁকে নেতৃত্বে দানে  সাহায্য করেন।

অন্ধ ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম (রাঃ) ছিলেন যুদ্ধের পতাকাবাহী।  আনাস (রাঃ) বলেন, আমি কাদেসিয়ার যুদ্ধের দিন ইবনু উম্মে মাকতূমকে বর্ম পরিহিত  অবস্থায় দেখেছি। তখন তাঁর হাতে ইসলামের ঝান্ডা ছিল।


পারসিক সেনাপতি:

পারস্য বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন রুস্তম ফাররাখযাদ। তাদের সৈন্য সংখ্যা  দুই লাখেরও অধিক ছিল।


পারসিক বাহিনীর অন্যান্য সেনাপতিগণ:

অগ্রগামী বাহিনীর দায়িত্বে ছিল বাহমান হাযুওয়াই যুল  হাজেব। যার সাথে আঠারটি হাতি ছিল এবং সেগুলোর উপর বহু সংখ্যক বাক্স ও তীরন্দায  সৈন্য ছিল। জালীয়ানুস মূল বাহিনীর কাছাকাছিতে থাকা দক্ষিণ বাহুর দায়িত্বে ছিল।  দক্ষিণ বাহুর দায়িত্বে ছিল হুরমুযান। তার সাথে আটটি হাতি এবং সেগুলোর উপর কিছু  বাক্স ও সৈন্য ছিল। বীরযান ছিল বাম বাহুর নেতৃত্বে, যা মূল বাহিনীর কাছাকাছি  অবস্থান করছিল। অপরদিকে বাম বাহুর সেনাপতি ছিল মেহরান। তার সাথে সাতটি হাতি ছিল।  এগুলোর উপরও বাক্স ও সৈন্য ছিল।


যুদ্ধের পটভূমি:

মুসলিম সৈন্যদের বড় একটা অংশ ইরাকে অবস্থান করছিল। ইরাকের ভূমি স্বাধীন  করার জন্য তারা পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এ যুদ্ধগুলোর মধ্যে  গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘জিসর’-এর (সেতুর) যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মুসলমানগণ ব্যাপকভাবে  ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর কিছুদিন পরেই সংঘটিত হয় বুওয়াইবের যুদ্ধ। যাতে পারসিকরা পরাজয়  বরণ করে এবং মুসলমানগণ বিরাট বিজয় অর্জনে সক্ষম হয়। অন্যভাবে বলা যায়, জিসরের  যুদ্ধের পরাজয়ের গ্লানি বুওয়াইবের যুদ্ধে জয় লাভ করার মাধ্যমে দূর হয়ে যায়।

এদিকে বুওয়াইবের যুদ্ধে পরাজিত ও ক্ষতিগ্রস্ত পারসিক বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ  সৈন্যদের ঐক্যবদ্ধ করে তোলে এবং তারা সম্রাট ইয়াযদাজারদ-এর দরবারে উপস্থিত হয়।  সম্রাট মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তাদের প্রধান সেনাপতি হিসাবে রুস্তমের  নাম ঘোষণা করেন। এরপর ইয়াযদাজারদ সৈন্যদের সামনে তাদের অতীত উজ্জ্বল ও গৌরবময়  ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উদ্দীপনা জাগানিয়া বক্তব্য প্রদান করেন। সেই সাথে  ইসলামী শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও যুদ্ধের ঘোষণা দেন। এরূপ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে ওমর  ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) পারস্য বিজয়ের কথা চিন্তা করলেন। সাথে সাথে ভৌগলিকভাবে  পূর্ব দিক থেকে ইসলামী খেলাফতের বিরুদ্ধে উত্থিত সকল ষড়যন্ত্র ধূলিসাৎ করে সারা  পৃথিবীতে ইসলামী আক্বীদা প্রতিষ্ঠার সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। ফলে ওমর  ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) আলী (রাঃ)-কে মদীনার দায়িত্ব অর্পণ করে নিজেই সৈন্যবাহিনী  নিয়ে মদীনা থেকে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞজনেরা তাঁকে মদীনায়  অবস্থান করে রাসূল (ছাঃ)-এর ছাহাবীদের মধ্য হ’তে কাউকে সেনাপতি নির্বাচন করার  পরামর্শ দিলেন।


ইবনুল আছীর বলেন, খলীফা ওমর (রাঃ) মদীনা থেকে বের হয়ে  ছারার নামক ভূমিতে অবতরণ করলেন এবং সেখানে সৈন্য সমাবেশ করলেন। লোকেরা তখনও জানত না  যে, তিনি মদীনায় অবস্থান করবেন, নাকি লোকদের সাথে যুদ্ধে যাবেন। ছাহাবীগণ তাঁকে  সরাসরি কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে পারতেন না। সেজন্য প্রথমে ওছমান (রাঃ) বা আব্দুর  রহমান বিন আওফ (রাঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর কাছে কোন কিছু জিজ্ঞেস করতেন। তাঁরা দু’জন  সক্ষম না হ’লে আববাস বিন আব্দুল মুত্ত্বালিব (রাঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হ’ত। ওছমান (রাঃ) তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি লোকদের জমা করে সকল বিষয়ে বর্ণনা করলেন। অতঃপর ইরাকে যাওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। সাধারণ সেনারা বলল, আপনি আমাদের সাথে চলুন। এরপর তিনি তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বললেন, তোমরা প্রস্ত্ততি গ্রহণ কর। আমি বিজ্ঞজনদের সাথে পরামর্শ করে বের হব। অতঃপর তিনি জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণকে আহবান করলেন।  সাথে সাথে মদীনার দায়িত্বে রত আলী ইবনু আবি ত্বালিব, অগ্রগামী সেনা ত্বালহা বিন  ওবায়দুল্লাহ, যুবায়ের ইবনুল আওয়াম ও আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ)-কে ডেকে পাঠালেন।  তাঁরা সকলে উপস্থিত হ’লে তিনি তাঁদের সাথে পরামর্শ করলেন। তারা একটি বিষয়ে একমত হ’লেন  যে, সেনাপতি হিসাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর একজন ছাহাবীকে নির্বাচন করা হোক এবং খলীফা  মদীনায় অবস্থান করে সৈন্য পরিচালনার দিক-নির্দেশনা প্রদান করবেন। অতঃপর ওমর (রাঃ) সেনাদের   ডেকে বললেন, আমি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য দৃঢ়  প্রতিজ্ঞ হয়েছিলাম। কিন্তু বিজ্ঞ পরামর্শদাতাগণ আমাকে উক্ত সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে  দিয়েছেন। এখন আমি মদীনায় অবস্থান করে রাসূল (ছাঃ)-এর একজন ছাহাবীকে সেনাপতির  দায়িত্ব অর্পণ করতে চাই। তোমরা এ ব্যাপারে আমাকে পরামর্শ দাও। লোকেরা সা‘দ বিন আবী  ওয়াক্কাছ (রাঃ)-এর নাম উল্লেখ করে তাঁকে সেনাপতির দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিলেন।  ফলে ওমর (রাঃ) সা‘দ (রাঃ)-কে প্রধান সেনাপতি নির্বাচন করলেন। কেননা তিনি জ্ঞান-গরিমায়  প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।


সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) প্রথম সারির ছাহাবী ছিলেন। তিনি ছিলেন ইসলাম  গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রগামী, প্রথমদিকে হিজরতকারী এবং জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত  ছাহাবী। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি আমার মামু। সম্মানের ক্ষেত্রে  আমার মামুর মত আর কার মামু আছে’? কেননা তিনি ও রাসূল (ছাঃ)-এর মা আমেনা একই বনু  যোহরা গোত্রের ছিলেন। সেজন্য রাসূল (ছাঃ) তাকে মামু বলতেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) বলেন, ওহোদের যুদ্ধের  দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার তূণীর এগিয়ে দিয়ে বলেন, ‘হে সা‘দ আমার পিতা-মাতা তোমার  জন্য উৎসর্গীত হেŠন! তুমি কাফেরদের  বিরুদ্ধে তীর নিক্ষেপ কর’। তিনি ছিলেন ইসলামের জন্য আল্লাহর পথে প্রথম তীর নিক্ষেপকারী। রাসূলুল্লাহ  (ছাঃ) তার জন্য দো‘আ করে বলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি তার দো‘আ কবুল কর এবং তার তীর  নিক্ষেপ সুনিপুণ কর’। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হে আল্লাহ! তুমি তার তীরকে লক্ষ্যভেদী কর  এবং তার দো‘আ কবুল কর’। অন্য বর্ণনায় আছে, ‘হে আল্লাহ! সা‘দ যখন দো‘আ করবে তুমি  তার দো‘আ কবুল কর’। সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) যখনই দো‘আ করতেন, তাঁর দো‘আ কবুল করা হ’ত।


যুদ্ধের কারণ:

(১) ইরাক থেকে মুসলিম শক্তিকে হঠানোর উদ্দেশ্যে পারস্যের জোটগুলির ঐক্যবদ্ধ  হওয়া: 

যখন মুসলমানগণ বিরাট বাহিনীকে পরাস্ত করে হীরা, আইনুত  তামার ও আনবারের মত শহরগুলো পদানত করে ফেললেন, তখন পারসিকরা ভাবল নিজেরা বিচ্ছিন্ন  থেকে ইসলামী শক্তিকে বাধা দেওয়া যাবে না। ফলে তারা সাসানী সাম্রাজ্যের সম্রাট  ইয়াযদাজারদ ইবনু শাহরিয়ারের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হ’ল। এভাবে  পারস্যের অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ হ’ল এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে  তাদেরকে ইরাক থেকে হটিয়ে দেওয়ার দূরভিসন্ধি অাঁটল।


(২) ইরাকের শান্তি ও নিরাপত্তা বিনষ্ট করা:

ইরাকের ইসলামী খেলাফতের মর্মমূলে আঘাত করার জন্য পারস্য সেনাপতি রুস্তম ইরাকের  গোত্র প্রধানদের গোপনে ডেকে তাদেরকে ইসলামী খেলাফতের অবাধ্য হ’তে ও এর বিরুদ্ধে  বিদ্রোহ ঘোষণা করতে উত্তেজিত করেন। ফলে হীরা সহ খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) ও মুছান্না  ইবনু হারেছাহ কর্তৃক বিজিত অঞ্চল সমূহে নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা দেখা দিল। এভাবে তারা  তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে মুসলমানদের ক্রুদ্ধ করে তুলল।

সেনাপতি সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) ইসলামের প্রতি দাওয়াত দিয়ে এবং এ  অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রতি আহবান জানিয়ে পারস্য সম্রাটের নিকট একদল  বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ প্রতিনিধি পাঠালেন। তারা মাদায়েনে গিয়ে তাদেরকে হিকমত ও সুন্দর  উপদেশ দানের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু কোন ফলাফল ছাড়াই বৈঠক শেষ হ’ল। ফলে  কাদেসিয়ার যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ল।


যুদ্ধের ঘটনা:

খলীফা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার পর  সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সৈন্য প্রেরণ করলেন।  সা‘দ (রাঃ) ক্বিদ্দীস ভবনের নিকটে কাদেসিয়ার উপযুক্ত স্থানে সৈন্য সমাবেশ করলেন। মুসলিম  সেনাবাহিনী এ স্থানে এক মাস যাবৎ অবস্থান করল। কিন্তু শত্রু বাহিনীর সাক্ষাৎ পেল  না। অবশেষে তারা ধারণা করল যে, হয়ত আর কোন যুদ্ধ হবে না। কিন্তু এক মাস পর পারস্য  বাহিনী সেনাপতি রুস্তমের নেতৃত্বে সেখানে এসে যথাস্থানে অবস্থান নিল।


পারসিক সেনাপতি রুস্তম মুসলিম সেনাপতি সা‘দ (রাঃ)-এর কাছে এ মর্মে প্রস্তাব  পাঠালেন যে, আলাপ-আলোচনা ও কিছু প্রশ্নের জওয়াব দেওয়ার জন্য একজন বিজ্ঞ লোক পাঠান  হোক। রুস্তমের উদ্দেশ্য ছিল এভাবে কালক্ষেপণ করে যুদ্ধ ব্যতীত মুসলিম সৈন্যদের  বিরক্ত ও ক্লান্ত করে তোলা। ফলে মুসলমানেরা দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলবে এবং অবশেষে  যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে যাবে। সেনাপতি সা‘দ (রাঃ) এটাকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার  মুখ্য সুযোগ মনে করে একে একে তিনজন বিজ্ঞ প্রতিনিধিকে রুস্তমের কাছে প্রেরণ করলেন।  ইতিপূর্বে সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য হীরা এবং  ছালুবায় লোক পাঠিয়েছিলেন। তারা সংবাদ পাঠাল যে, পারস্য সম্রাট তার বিশাল বাহিনী  দিয়ে রুস্তমকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তখন সা‘দ (রাঃ) এ খবর জানিয়ে  খলীফা ওমর (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখলেন। উত্তরে ওমর (রাঃ) লিখলেন যে, তাদের এ ধরনের  সংবাদ তোমাকে যেন কখনই বিচলিত এবং চিন্তিত না করে। বরং তুমি সর্বদা আল্লাহর নিকট  সাহায্য প্রার্থনা করবে এবং তাঁর উপরই ভরসা করবে। আর সেনাপতি রুস্তমের কাছে একজন  বিজ্ঞ ও সচেতন লোক পাঠাবে, যে তাকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা  এ দাওয়াতকে তাদের মধ্যে দুর্বলতার কারণ বানাবেন এবং তাদের ঐক্যে চিড় ধরাবেন’। অতঃপর রুস্তম যখন তার সৈন্য নিয়ে  কাছাকাছি স্থানে অবতরণ করেন, তখন সা‘দ (রাঃ) খলীফার নিকট সব জানিয়ে পত্র লিখলেন। যাতে  শত্রু পক্ষের ঘোড়াসমূহ এবং তেত্রিশটি হাতির উল্লেখ ছিল। এরপর সা‘দ (রাঃ) একদল বিজ্ঞ ছাহাবীকে রুস্তমের কাছ  পাঠালেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নু‘মান ইবনু মুকারিন, ফুরাত ইবনু হিববান, হানযালা,  উত্বারেদ, আশ‘আছ, মুগীরা ইবনু শু‘বা, আমর ইবনু মা‘দীকারিব প্রমুখ। তাঁরা রুস্তমকে  আল্লাহর পথে দাওয়াত দিলেন। তখন রুস্তম তাঁদেরকে বললেন, তোমরা এখানে কি জন্য এসেছ?  তারা বললেন, আমরা এখানে এসেছি আল্লাহর অঙ্গীকার পূরণের জন্য এবং এদেশ দখল করে  আপনাদের নারী ও সন্তানদের বন্দি ও সম্পদসমূহ গ্রহণ করার জন্য। আর এ বিষয়ে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।  অবশ্য রুস্তম ইতিপূর্বে স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, আকাশ থেকে যেন একজন ফেরেশতা এসে  পারস্য বাহিনীর সকল অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে অর্পণ করলেন এবং  রাসূল (ছাঃ) তা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর হাতে সমর্পণ করলেন।


অন্য বর্ণনায় রয়েছে, সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) রিবঈ ইবনু আমের, হুযায়ফা  ইবনু মিহছান ও মুগীরা ইবনু শু‘বা (রাঃ)-কে আলাদা আলাদাভাবে রুস্তমের কাছে পাঠান।  রিবঈ ইবনু আমের (রাঃ) যখন স্বীয় জীর্ণ-শীর্ণ মোটা পোশাক পরে অস্ত্র নিয়ে তাঁর ছোট  ঘোড়াটির উপর আরোহণ করে রুস্তমের দরবারে প্রবেশ করলেন এবং ঘোড়ার পদাঘাতে ঘরে বিছানো  গালিচা ফেটে গেল। তখন তারা বলল, অস্ত্র রেখে প্রবেশ কর। রিবঈ ইবনু আমের (রাঃ)  বললেন, আমি স্বেচ্ছায় এখানে আসিনি। আপনারা ডেকে পাঠিয়েছেন  বলেই এসেছি। যদি আপনারা আমাকে এ অবস্থায় ভিতরে প্রবেশ করতে দেন, তাহ’লে প্রবেশ করব,  অন্যথায় ফিরে যাব। তখন সৈন্যরা রুস্তমকে তার কথা বললে তিনি প্রবেশের অনুমতি দিলেন।  রিবঈ (রাঃ) তার বর্মের উপর ভর দিয়ে প্রবেশ করার কারণে অধিকাংশ গালিচা ছিঁড়ে  গেল। অতঃপর তারা বলল, তোমরা এখানে কি উদ্দেশ্যে এসেছ? তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা  আমাদেরকে এখানে আসার ব্যবস্থা করেছেন। যাতে আমরা তাঁর ইচ্ছায় লোকদেরকে মানুষের  দাসত্ব থেকে বের করে আল্লাহর দাসত্বে, সংকীর্ণ পৃথিবীর মোহ হ’তে প্রশস্ত  জান্নাতের দিকে, খ্রিস্টান ধর্মের অত্যাচার থেকে বের করে ন্যায় ও ইনছাফের ধর্ম  ইসলামের দিকে নিয়ে যেতে পারি। তিনি আমাদেরকে তাঁর সত্য দ্বীন সহ প্রেরণ করেছেন মানবজাতির  কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার জন্য। যারা এ ধর্ম গ্রহণ করবে, আমরা তাদেরকে ভাই  হিসাবে গ্রহণ করব এবং তাদেরকে নিরাপদে রেখে ফিরে যাব। আর যারা এ ধর্ম গ্রহণে  অস্বীকৃতি জানাবে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করতে থাকব, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর  কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেন।

তারা বলল, আল্লাহকৃত ওয়াদা কি?

তিনি বললেন, ইসলাম অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যারা মারা যাবে,  তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত এবং যারা বেঁচে থাকবে তাদের জন্য বিজয়।

রুস্তম বললেন, আমি তো তোমাদের বক্তব্য শুনলাম, আমরা কি এ বিষয়টিকে বিলম্বিত  করতে পারি না? যাতে আমরা উভয় পক্ষ ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি।

তিনি বললেন, হ্যাঁ করা যায়। তবে কয়দিন চান, একদিন না দু’দিন?

তিনি বললেন, না। বরং আমাদের বিজ্ঞ ও জ্ঞানীদেরকে অবহিত না করা পর্যন্ত।

রিবঈ (রাঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের জন্য এই সুনণাত চালু করেননি  যে, আমরা শত্রুদেরকে তিনদিনের বেশী অবকাশ দিব। বরং আপনার এবং তাদের বিষয় ভেবে দেখুন  ও তিনটির যেকোন একটি বেছে নিন। ইসলাম গ্রহণ, জিযিয়া প্রদান অথবা যুদ্ধ।

রুস্তম রিবঈ ইবনু আমের (রাঃ)-কে বললেন, আপনি কি তাদের সরদার?


রিবঈ (রাঃ) বললেন, না। তবে মুসলমানগণ একটি দেহের মত। তাদের সব থেকে  নিম্নস্তরের ব্যক্তি উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের রক্ষা করে (নেতৃত্ব দিতে পারে)।

অতঃপর পারসিক সেনাপতি রুস্তম গোত্রপতিদের সমবেত করে বললেন, তোমরা কি কখনও এ  ব্যক্তির চেয়ে উত্তম ও বাগ্মিতাপূর্ণ কথা শুনেছ? তারা বলল, আল্লাহর কাছে আশ্রয়  চাই। আপনি কি এ লোকটির প্রতি ঝুঁকে পড়েছেন এবং নিজের ধর্ম ত্যাগ করে এই কুকুরের  ধর্মের দিকে ধাবিত হচ্ছেন ? আপনি কি তার পোশাকের প্রতি লক্ষ্য করেছেন? রুস্তম  বললেন, তোমাদের জন্য ধ্বংস হোক, তোমরা তার পোশাকের প্রতি লক্ষ্য করো না; বরং তার  সুচিন্তিত মতামত, প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য এবং নীতির প্রতি লক্ষ্য কর। আরবরা অনাড়ম্বর  কাপড় পরে, কম ভক্ষণ করে। কিন্তু বংশমর্যাদা রক্ষা করে।


অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, রুস্তম যখন রিবঈ ইবনু আমেরের সাথে কথা বলে  মুসলমানদের দৃঢ় মনোবলের কথা জানতে পারলেন, তখন তিনি অন্য মুসলমানদের মতামত জানার উদ্দেশ্যে  আর একজন বিজ্ঞ ব্যক্তিকে পাঠাবার জন্য সা‘দ (রাঃ)-এর কাছে পত্র লিখলেন। সা‘দ (রাঃ)  পত্র পেয়ে মুগীরা ইবনু শু‘বা (রাঃ)-কে পাঠালেন। রুস্তম মুগীরা (রাঃ)-কে তার  প্রচন্ড রাগ প্রদর্শন করে বললেন, তোমাদের দৃষ্টান্ত হ’ল মাছির মত। যে মধু দেখে  আমাদের ভূমিতে প্রবেশ করে বলল, যে আমাকে মধুর কাছে পৌঁছে দিবে তাকে দুই দিরহাম  দেওয়া হবে। অতঃপর যখন সে মধুতে পড়ে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হ’ল, তখন সে মুক্ত হওয়ার  জন্য চিৎকার শুরু করল। কিন্তু সে কোন রক্ষাকারী না পেয়ে বলা শুরু করল, যে আমাকে  রক্ষা করবে তার জন্য চার দিরহাম রয়েছে। তিনি আরো বললেন, তোমাদের উদাহরণ ঐ দুর্বল শৃগালের  মত, যে ফলের বাগানের একটি গর্তে প্রবেশ করল এবং আল্লাহ যতদিন চাইলেন ফল খেয়ে  সেখানে বসবাস করতে থাকল। বাগানের মালিক এসে দেখল যে, এটি একটি দুর্বল প্রাণী। তাই  তার প্রতি দয়া করে তাকে ছেড়ে দিল। কিন্তু যখন তার বসবাস দীর্ঘায়িত হ’ল এবং ফল  ভক্ষণ করে স্বাস্থ্য ভাল হ’ল এবং নাদুস-নুদুস হয়ে উঠল, তখন সে বাগানের অনেক কিছুই  নষ্ট করতে শুরু করল। ফলে বাগানের মালিক তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে লোকজন নিয়ে বাগানে  আসল এবং রাখালদের সহযোগিতা কামনা করল। এ দিকে শৃগাল পলায়ন করার জন্য পথ খুঁজে না  পেয়ে যে সুড়ঙ্গ দিয়ে বাগানে প্রবেশ করেছিল সেই গর্তে প্রবেশ করল। কিন্তু সে অতি  মোটা হয়ে যাওয়ায় বের হ’তে পারল না। শিশুরা তাকে বের করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হ’ল। ফলে  তারা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলল।


এভাবেই তোমরা আমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত হবে। অবশ্য আমি জানি, হে আরব  সম্প্রদায়! ক্ষুধার তাড়না তোমাদেরকে এদেশে আসতে বাধ্য করেছে। তোমরা আমাদেরকে প্রাসাদ  নির্মাণ ও শত্রুদমন থেকে ব্যস্ত রেখেছ। অতএব তোমরা ফিরে যাও, আমরা যব ও খেজুর দিয়ে  তোমাদের বাহন ভরে দিব এবং তোমাদের পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করে দিব। তোমরা ফিরে  যাও, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন।


মুগীরাহ বিন শু‘বা (রাঃ) বললেন, ক্ষুধার তাড়নার কথা বলবেন না। আপনি যা  বললেন, তার থেকেও আমরা কষ্টে ছিলাম। জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে সেই  শ্রেষ্ঠ ছিল, যে তার চাচাতো ভাইকে হত্যা করে চাচার সকল সম্পদের মালিক হ’ত এবং তা  ভক্ষণ করত। আমরা মৃত প্রাণী, তাদের রক্ত ও হাড় খেতাম। এভাবে আমাদের জীবন চলছিল।  এরই মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা আমাদের মধ্যে একজন নবী পাঠালেন এবং তাঁর উপর কিতাব নাযিল  করলেন। তিনি এই কিতাবের মাধ্যমে আমাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর প্রতি নাযিলকৃত অহি-র  প্রতি আহবান জানালেন। অতঃপর আমাদের কেউ তাঁকে বিশ্বাস করল এবং কেউ তাঁর প্রতি  মিথ্যারোপ করল। এরপর তিনি বিশ্বাসীদের সাথে নিয়ে মিথ্যুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন। অতঃপর আমরা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাঁর দ্বীনে প্রবেশ করলাম। অবশেষে স্পষ্ট হয়ে গেল যে,  তিনি সত্যবাদী এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল। এরপর তিনি আমাদেরকে  বিরোধীদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়ে বললেন, যারা এপথে যুদ্ধ করে নিহত হবে,  তাদের জন্য রয়েছে সুখময় জান্নাত। আর যারা জীবিত থাকবে তারা রাজ্য পরিচালনা করবে  এবং বিরোধীদের উপর সফলকাম হবে। এখন আমরা আপনাকে আহবান জানাচ্ছি যে, আপনি আল্লাহ ও  তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনুন এবং আমাদের ধর্মে প্রবেশ করুন। আপনি যদি এটা মেনে  নেন, তাহ’লে এ রাজ্য আপনারই থাকবে। এখানে আপনার প্রিয় ব্যক্তি ব্যতীত কেউ প্রবেশ  করবে না। তবে যাকাত ও গণীমতের মালের এক-পঞ্চমাংশ প্রদান করবেন। আর ইসলাম গ্রহণ না  করলে, জিযিয়া দিয়ে নিরাপদে বাসবাস করবেন। আর যদি এর কোনটাই গ্রহণ না করেন, তাহ’লে  আল্লাহ যতদিন না আমাদের মধ্যে ফায়ছালা করবেন, ততদিন যুদ্ধ চলতে থাকবে।


সব কথা শুনে রুস্তম বললেন, তোমরা তো আমাদের প্রতিবেশী। তোমাদের সাথে আমরা  ভাল আচরণ করে থাকি। তোমাদের বিপদ-আপদে সাহায্য করে থাকি। অতএব তোমরা দেশে ফিরে  যাও। আমাদের দেশের সাথে বাণিজ্য করতে তোমাদের কোন বাধা দিব না। মুগীরা বিন শু‘বা (রাঃ)  বললেন, আমরা দুনিয়ার কোন কিছুই চাই না। আমাদের একান্ত চাওয়া-পাওয়া হ’ল পরকাল।


এরপর রুস্তম বললেন, আমরা অবশ্যই তোমাদের হত্যা করব। মুগীরা বললেন, আপনারা  আমাদের হত্যা করলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করব। আর আমরা আপনাদের হত্যা করলে আপনারা  জাহান্নামে যাবেন। অতঃপর রুস্তম সূর্যের নামে কসম করে বললেন, আমরা অবশ্যই তোমাদের  হত্যা করব। তখন মুগীরা (রাঃ) বললেন, অচিরেই জানা যাবে কে কাকে হত্যা করে।


অতঃপর রুস্তম মুগীরা বিন শু‘বা (রাঃ)-কে বললেন, আমি  তোমাদের কিছু পোশাক-পরিচ্ছদ, তোমাদের আমীরের জন্য এক হাযার দীনার এবং কাপড় ও বাহন  দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি। তোমরা আমাদের দেশ থেকে ফিরে যাও। মুগীরা (রাঃ) বললেন, এটা  খুব দূরে নয় যে, আমরা আপনাদের রাজ্যকে দুর্বল করে দিব, শক্তিশালীদের হীনবল করব এবং  আপনাদের এদেশ আমাদের হয়ে যাবে। অতঃপর আপনারা নীচু হয়ে আমাদেরকে জিযিয়া দিবেন এবং আপনারা  অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের দাসে পরিণত হবেন’। এ কথা শুনে তারা চিৎকার দিয়ে বলল,  তোমাদের সাথে আমাদের কোন সন্ধি হবে না।


এরপর মুগীরাহ বিন শু‘বা (রাঃ) রুস্তমকে বললেন, তাহ’লে আপনারা নদী পার হয়ে  আসবেন, না আমরা নদী পার হয়ে যাব? রুস্তম বললেন, বরং আমরা নদী পার হয়ে গিয়ে যুদ্ধ  করব। এরপর তারা পার হয়ে না আসা পর্যন্ত মুসলমানগণ  অপেক্ষা করলেন। তারা যখন পার হয়ে আসল তখন  মুসলমানগণ তাদের উপর হামলা করে পরাস্ত করলেন।


প্রিয় পাঠকবৃন্দ! একটু চিন্তা করে দেখুন, মুসলমানগণ  যুদ্ধ এড়ানোর জন্য পাঁচ বারেরও অধিক একাধিক ব্যক্তিকে রুস্তমের সাথে আলোচনা করার  জন্য পাঠিয়েছেন। সুতরাং ইসলামের যুদ্ধনীতির শান্তিপূর্ণ দিকটি ফুটে ওঠে।


যুদ্ধের পূর্বে সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি বাহনে  আরোহণ করতে অক্ষম হয়ে গেলেন। ফলে তিনি যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন খালিদ ইবনু  আরফাত্বাহ (রাঃ)-কে এবং নিজে ক্বিদ্দীস ভবনের ছাদে উঠে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ ও ইবনু  আরফাত্বাহকে নির্দেশনা দিতে থাকলেন।

অপরদিকে রুস্তম তার সৈন্যদের কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত করলেন এবং সার্বিক  সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য গোয়েন্দা বিভাগকে সতর্ক করলেন। এটা ছিল চারদিন ব্যাপী  কঠিন একটি যুদ্ধ। আরবরা এদিন প্রথম রাতে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। যা ছিল তাদের রীতিবিরুদ্ধ।


বিঃদ্রঃ বাকি লিখা পরের পোস্টে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন