কাদেসিয়া যুদ্ধ পোস্ট (২) যুদ্ধের প্রথম দিন: আরমাছ

 


যুদ্ধের প্রথম দিন: আরমাছ

‘রমছ’ শব্দের অর্থ হ’ল মিলে  যাওয়া। যেহেতু এ দিনে বিশাল দু’দল সৈন্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে একে অপরের মধ্যে মিশে গিয়েছিল,  সেজন্য এদিনকে ‘আরমাছ’ (বলা হয়। এ দিনে যুদ্ধের কোন ফলাফল আসেনি।  তবে মুসলমানগণ এ দিনে তেত্রিশটি হাতির দল দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। যেগুলিকে সেনাপতি  রুস্তম তিনভাগে ভাগ করেছিলেন। যাদের মধ্যে একটি সাদা হাতিও ছিল। মূল বাহিনীতে ছিল  আঠারটি হাতি, দক্ষিণ বাহুতে আটটি এবং বাম বাহুতে ছিল সাতটি।

যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে সা‘দ (রাঃ) সূরা আনফাল পাঠের নির্দেশ  দিলেন। জিহাদের সূরা পাঠ করা হ’লে মুসলমানদের হৃদয় ও চোখ আনন্দে ভরে গেল এবং তারা  প্রশান্তি লাভ করলেন। এ সূরা পাঠ শেষ হ’লে সেনাপতি সা‘দ (রাঃ) বললেন, যোহর ছালাত  সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা নিজ নিজ স্থানে অবস্থান করবে। ছালাত শেষে আমি চারটি  তাকবীর ধ্বনি দিব। আমি তাকবীর দিলে তোমরাও তাকবীর দিয়ে প্রস্ত্ততি গ্রহণ করবে। যখন  দ্বিতীয় তাকবীর শুনবে, তোমরা তাকবীর দিয়ে যুদ্ধের পোশাক পরবে। আমি তৃতীয় তাকবীর  দিলে তোমরা তাকবীর দিয়ে ঘোড়াগুলোকে প্রস্ত্তত করবে। আর চতুর্থ তাকবীর দিলে  শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং পড় ‘লা হাওলা ওয়া লা-কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ (নেই কোন ক্ষমতা নেই কোন শক্তি  আল্লাহ ব্যতীত)’।

যুদ্ধের পূর্বে সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) আরবের বিজ্ঞ ব্যক্তি, সুবক্তা,  সুপরামর্শদাতা ও কবিদের একত্রিত করলেন। অতঃপর তাদেরকে নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী  সৈন্যদের সামনে গিয়ে উৎসাহপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার আহবান জানালেন। তারা গিয়ে সৈন্যদের  সামনে বক্তব্য প্রদান ও কবিতা আবৃত্তি করার মাধ্যমে তাদেরকে উদ্দীপিত করে তুললেন।


(১) ক্বায়েস বিন হুবায়রাহ আল-আসাদী বললেন, হে লোক সকল!  তোমরা আল্লাহর প্রশংসা কর, যিনি তোমাদেরকে যে পথের নির্দেশনা দিয়েছেন এবং যার  দ্বারা পরীক্ষা করেছেন সেজন্য। তাহ’লে আল্লাহ তোমাদেরকে বেশী করে দিবেন। তোমরা  আল্লাহর নে‘মত সমূহ স্মরণ কর এবং তার সন্তুষ্টি লাভে মনোনিবেশ কর। তোমাদের সামনে  রয়েছে জান্নাত নতুবা গণীমত। আর এ ভবনের পিছনে তৃণবিহীন প্রান্তর, নির্জন মরুভূমি, শুষ্ক  পাত্র এবং দুর্গম এলাকা ছাড়া কিছুই নেই।

এরপর


(২) গালেব আল-আসাদী দাঁড়িয়ে বললেন, হে লোক সকল! তোমাদেরকে আল্লাহ এ  যুদ্ধের জন্য নির্বাচন করায় তোমরা তাঁর প্রশংসা কর। তোমরা তাঁর কাছে চাও। তিনি  তোমাদের বেশী বেশী দিবেন! তোমরা প্রার্থনা কর  তিনি কবূল করবেন। হে অস্ত্রসজ্জিত সৈন্যগণ! ঘোড়ায় আরোহণ করা অবস্থায় আজকে তোমাদের  কেউ দুর্বল করতে পারবে না। আর তোমাদের সাথে যা (তরবারী) আছে, তা তোমাদের অবাধ্য হবে  না। আগামী দিন লোকেরা কি আলোচনা করবে তা চিন্তা কর। কারণ তোমাদেরকে দিয়ে তাদের  আগামীকাল শুরু হবে। আর তোমাদের পরবর্তীদের প্রশংসা করা হবে’। অতঃপর


(৩) ইবনু  হুযায়েল আসাদী দাঁড়িয়ে বললেন, হে সৈন্যগণ! তোমরা তরবারীকে রক্ষাকারী হিসাবে গ্রহণ  কর এবং তাদের বিরুদ্ধে কাল দুর্গের ন্যায় হয়ে যাও। তাদের জন্য নেকড়ের ন্যায়  ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন হয়ে যাও। চিৎকার ধ্বনিকে বর্ম পরাও, আল্লাহর উপর আস্থাশীল হও  এবং চক্ষু অবনমিত রাখ। যখন তরবারী উন্মুক্ত হয়, তখন তা অনুগত হয়ে যায়। আর তোমরা  তাদের উপর পাথর নিক্ষেপ করবে। কেননা পাথর এমন কিছু ঘটাবে যা লোহা ঘটাতে পারে না।

ইবনু হুযায়েলের বক্তব্য শেষ হ’লে


(৪) বিশর বিন আবী রুহম জুহানী দাঁড়িয়ে  বক্তব্য দিলেন। তিনি বললেন, হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহর প্রশংসা কর এবং কাজের  মাধ্যমে তোমাদের কথাগুলোকে সত্যে পরিণত কর। তোমাদের হেদায়াতের জন্য তোমরা তো  আল্লাহর প্রশংসা করেছ এবং তাঁর একত্ববাদ ঘোষণা করেছ। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই।  তোমরা তার বড়ত্বও বর্ণনা করেছ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছ। অতএব  তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। তোমরা দুনিয়াবী জীবনকে অন্য সব কিছু থেকে  সহজভাবে গ্রহণ করবে। কেননা দুনিয়া তার কাছে আসে, যে তাকে তুচ্ছ মনে করে। তোমরা তার  দিকে ধাবিত হয়ো না। কারণ তা পলায়ন করবে। আর তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তিনি  তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।

বিশর ইবনু আবী রুহম বক্তব্য শেষ করলে


(৫) আছেম ইবনু আমের তামীমী দাঁড়িয়ে  বললেন, হে আরব সম্প্রদায়! তোমরা তো আরবের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তোমরা অনারবদের  থেকে তাদেরকে রক্ষা করেছ। তোমরা জান্নাত লাভের ঝুঁকি নিয়েছ, আর তারা দুনিয়া  প্রাপ্তির ঝুঁকি নিয়েছে। অতএব তোমাদের কাছে দুনিয়া যেন কখনও পরকালের উপর গুরুত্ব  না পায়। তোমরা আজকের দিনে এমন ঘটনা সংঘটিত করো না, যা পরবর্তীতে আরবদের জন্য কলঙ্কজনক  হয়ে থাকবে।

এরপর


(৬) রিবঈ বিন আমের (রাঃ) তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, আল্লাহ তা‘আলা  তোমাদেরকে ইসলামের হেদায়াত দান করেছেন এবং এর উপর ঐক্যবদ্ধ করেছেন। আর অশেষ নে‘মত  দেওয়ার কথা বলেছেন। ধৈর্যধারণের মধ্যেই রয়েছে প্রশান্তি। তোমরা ধৈর্যধারণে নিজেদের  অভ্যস্ত কর, তাহ’লে ধৈর্যশীল হ’তে পারবে। তোমরা অস্থিরতার অভ্যাস করো না, তাহ’লে  ধৈর্যহারা হবে।


অপরদিকে পারস্য বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান নিল। তারা তাদের সৈন্যদের বিভিন্নভাবে  উৎসাহিত করল। এরপর সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) তৃতীয় বার তাকবীর দিলে গালিব বিন  আব্দুল্লাহ আযদী দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য সামনে বের হ’লেন। তাকে দেখে শত্রুপক্ষের  হুরমুয এগিয়ে আসল। গালিব তাকে ধরাশায়ী করে সা‘দ (রাঃ)-এর কাছে বন্দি করে আনলেন।  এরপর তুলায়হা আসাদী সামনে অগ্রসর হয়ে তাদের কতিপয় বড় বড় নেতাকে হত্যা করলেন।


অতঃপর সা‘দ (রাঃ) ক্বিদ্দীস ভবনের ছাদের উপর থেকে চতুর্থ তাকবীর দিয়ে  ব্যাপক যুদ্ধের ঘোষণা করলেন। ফলে উভয়পক্ষ তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হ’ল। মুসলিম সৈন্যরা  যুদ্ধ করছে, আল্লাহর কালেমাকে সমুন্নত করার জন্য এবং পারস্যবাসী ও কিসরার  সন্তানদের অগ্নিপূজা থেকে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ইবাদতের দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য।  অপরদিকে পারস্য বাহিনী যুদ্ধ করছে সম্রাট ইয়াযদাজারদ ও তাঁর সন্তানদের জন্য, যারা  আল্লাহকে ছেড়ে আগুনের পূজা করে  তাদের  রক্ষা করার জন্য।


এদিকে পারস্য বাহিনীর হাতি স্কোয়াড বনু আসাদ গোত্রের উপর  হামলা করল। ইতিপূর্বে আরবের ঘোড়াগুলোর কখনও যুদ্ধে হাতি দেখার অভিজ্ঞতা ছিল না।  ফলে ঘোড়াগুলো ভড়কে গেল। এতে বনু আসাদের কাতার সমূহের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হ’ল।  এই সুযোগে পারস্য বাহিনী তাদের উপর হামলা জোরদার করল এবং হাতিগুলো ঘুরে ঘুরে হামলা  করতে থাকল। সেনাপতি সা‘দ (রাঃ) উপর থেকে এ দৃশ্য অবলোকন করে কা‘কা‘ (রাঃ)-এর ভাই  আছেম ইবনু আমরকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। আছেম ছিলেন তামীম গোত্রের।  যারা ঘোড়া এবং উট পরিচালনার কৌশল খুব ভাল করেই জানত।


ইবনু জারীর বলেন, সা‘দ (রাঃ) আছেমকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বললে তিনি বনু  তামীমকে বললেন, হে বনু তামীম! তোমরা কি উট এবং ঘোড়ার মালিক নও? এসব হাতির বিরুদ্ধে  যুদ্ধ করার কোন কৌশল কি তোমাদের জানা নেই? তারা বলল, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! আমাদের  জানা আছে। অতঃপর তিনি তাঁর কওমের কিছু তীরনদায ও কিছু অস্ত্র পরিচালনায় পারদর্শী  ব্যক্তিকে ডেকে বললেন, হে তীরন্দায দল! তোমরা তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে হাতির উপরে  থাকা সৈন্যদের পরাস্ত কর। আর হে অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ! তোমরা হাতির পিছনে গিয়ে হাওদা  কেটে ফেল। তিনি বনু আসাদকে সাহায্যের জন্য বের হ’লেন। তখনও হাতি পা দিয়ে বনু আসাদ  গোত্রকে পিষ্ট করছিল। আছেমের সাথীরা হাতির পিছন দিক থেকে এসে তাদের হাওদা এবং  বাক্সের রশিগুলো কেটে ফেলল। এতে হাতিগুলোর চিৎকার বেড়ে গেল। সেদিন এমন কোন হাতি  ছিল না যার হাওদাজ বিচ্ছিন্ন করা হয়নি এবং তাদের উপরে থাকা লোকদের হত্যা করা হয়নি।  মুসলিম সৈন্যরা আবার সামনে ফিরে আসল এবং বনু আসাদের উপর আপতিত বিপদ দূর করতে সক্ষম  হ’ল। সূর্যাস্ত পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকল। পারস্য বাহিনী তাদের ঘাঁটিতে ফিরে গেল। ঐদিন  সন্ধ্যায় বনু আসাদের পাঁচশত লোক শহীদ হয়।


আরমাছ এর  দিন মুসলমানের জন্য খুবই দুর্বিষহ ছিল। কিন্তু তারা অসীম ধৈর্যের পরিচয় দেয়। দিনের  শেষ অবধি ক্লান্তিহীনভাবে বীরত্বের সাথে তারা শত্রুদের মুকাবিলা করে হস্তিবাহিনীর  বিপর্যয় থেকে মুসলিম বাহিনীকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়।


যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন : আগওয়াছ 

‘আগওয়াছ’  ‘গাওছ’  শব্দের বহুবচন, অর্থ সাহায্য। যেহেতু হাশেম  বিন উতবা বিন আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে ছয় হাযার সৈন্য সিরিয়া থেকে  সাহায্যকারী হিসাবে আগমন করে, যার প্রথম দলে এক হাযার সৈন্য নিয়ে তিনি কা‘কা‘ বিন  আমর তামীমীকে পাঠিয়ে দেন। এজন্য এই দিনকে গাওছ  তথা সাহায্য প্রাপ্তির দিন বলা হয়। শহীদগণের জন্য খননকৃত (উযায়েব ও আয়নুশ শামস এর  মধ্যবর্তী স্থানে) কবরে দাফন করার জন্য এবং আহতদের চিকিৎসা কেন্দ্রে বহন করে নিয়ে  যাওয়ার মধ্য দিয়ে মুসলমানগণ এ দিনের সূচনা করে। যখন শহীদ ও আহতদের উযায়েবের দিকে  নিয়ে যাওয়া হচিছল, তখনই কা‘কা‘ ইবনু আমর (রাঃ) সিরিয়া থেকে আগমন করলেন।


এ দিনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল এই যে, এদিন হস্তী বাহিনীর সমাবেশ  ঘটেনি। কারণ প্রথম দিন সকল হাতির উপরে বেঁধে রাখা বাক্স ও হাওদাজ মুসলমান সৈন্যরা  কেটে দিতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে পারসিক সৈন্যরা হাতির উপর নতুন বাক্স ও হাওদাজ স্থাপন  করতে ব্যস্ত ছিল।

কা‘কা‘ ইবনু আমর যখন যুদ্ধের ময়দানে পৌছলেন তখন মুসলমান  সৈন্যরা পারসিক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। তিনি মুসলমান সৈন্যদের হৃদয় থেকে  ভয়-ভীতি ও আতঙ্ক দূর করে তাদের মধ্যে সাহস সঞ্চার করার চেষ্টা করলেন। কৌশল হিসাবে  তিনি তার সাথে থাকা সৈন্যদের একশ’ জনকে আলাদা আলাদা দলে ভাগ করলেন এবং প্রত্যেক দলকে  তাকবীর ধ্বনি দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশের নির্দেশ দিলেন। সৈন্যরা তার কমান্ড  অনুযায়ী একশ’ জন করে তাকবীর দিয়ে ময়দানে প্রবেশ করল। তাদের তাকবীর শুনে অন্যান্য  সৈন্যরাও তাকবীর ধ্বনি দিতে শুরু করল। এতে মুসলমান সৈন্যদের মনে শক্তি ও সাহস  বৃদ্ধি পেল এবং পারস্য বাহিনী হীনবল হয়ে পড়ল। এভাবে কা‘কা‘ ইবনু আমরের পরিচালনায়  সিরিয়া থেকে আগত সাহায্যকারী বাহিনী তাদের সকলকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল।


এরপর কা‘কা‘ ইবনু আমর কাতার থেকে সামনে এসে বললেন, হে পারস্য বাহিনী!  তোমাদের কে আছে যে আমার সাথে লাড়াই করবে? এ কথা শুনে সেনাপতি যুল হাজেব বাহমন  জাযুওয়াইহ এগিয়ে আসল। কা‘কা‘ বললেন, তুমি কে? সে বলল, আমি বাহমান জাযুওয়াইহ্। তখন  তিনি বললেন, হে আবু ওবায়েদের হত্যাকারী ও জিসরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী! এরপর দু’জনে  যুদ্ধে লিপ্ত হ’লেন। কা‘কা‘ নিমেষেই তাকে খতম করে দিলেন। কা‘কা‘ আবার বললেন, কে আছে  আমার সাথে যুদ্ধ করবে? তখন পারস্য সেনাপতি বীরযান ও বান্দুওয়ান ছুটে আসল। এ দৃশ্য  দেখে মুসলিম সেনা হারেছ বিন যুবইয়ান সামনে অগ্রসর হ’লেন। কা‘কা‘ বীরযানের সাথে  যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে নিমিষেই তার দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন। আর হারেছ  বান্দুয়ানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হ’লেন এবং তিনিও ক্ষণিকের মধ্যে বান্দুয়ানের দেহ  থেকে মস্তক আলাদা করে দিলেন। কা‘কা‘ বলা শুরু করলেন, হে মুসলমানগণ! তোমরা তরবারী  দিয়ে তাদের মুকাবিলা কর। কেননা এর মাধ্যমে লোকদের হত্যা করা যায়। অতঃপর লোকেরা তার  উপদেশ গ্রহণ করে যুদ্ধে লিপ্ত হ’ল। কা‘কা‘ ইবনু আমর এ দিন ত্রিশজন সৈন্যকে দ্বন্দ্বযুদ্ধের  জন্য আহবান করেন এবং তাদের সকলকে হত্যা করতে সক্ষম হন। আবুবকর (রাঃ) বলেন, সে সৈন্যদল  পরাজিত হবে না, যাদের মধ্যে কা‘কা‘ ইবনু আমর থাকবেন।


এরপর মুসলমান সৈন্যরা হস্তিবাহিনীর অনুপস্থিতিকে কাজে লাগাল। তাদের উটগুলোকে  কালো পোষাক পরিয়ে দিল এবং বড় বড় হাওদাজ তৈরী করে সেগুলোর উপর স্থাপন করল এবং দশজন  করে তার উপর আরোহণ করল। এ দৃশ্য দেখে পারস্য বাহিনীর ঘোড়াগুলো ভয়ে পিছিয়ে গেল।


আবু মেহজান ছাক্বাফী গাওছের দিন অত্যন্ত বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তিনি মূলতঃ  পারসিক মুসলিম ছিলেন। তিনি অতিরিক্ত মদ্যপান সত্ত্বেও যুদ্ধ বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন।  ইবনু সীরীন বলেন, আবু মেহজান মদ্যপানের অপরাধে প্রায়ই বেত্রাঘাতের শাস্তি ভোগ  করতেন। যখন অতি মাত্রায় মদপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেন, তখন তাকে বেঁধে উম্মে ওয়ালাদ  যাবরার দায়িত্বে আটক রাখা হ’ল। আবু মেহজান কাদেসিয়ার যুদ্ধের দিনে মুসলমানদের নিহত  হ’তে দেখে আফসোস করে বললেন, আমার দুঃখের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, মুসলমানদের  ঘোড়াগুলোকে বর্শা দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে, অথচ আমাকে আবদ্ধ অবস্থায় সকাল করতে  হচ্ছে…। তখন তিনি সেনাপতি সা‘দ (রাঃ)-এর স্ত্রী সালমার কাছে পত্র মাধ্যমে সংবাদ  পাঠালেন যে, আবু মেহজান আপনাকে বলছে, আপনি যদি তাকে মুক্ত করে দেন এবং এই [সা‘দ  (রাঃ)-এর] ঘোড়ার উপর আরোহণ করতে দেন ও তার কাছে অস্ত্র প্রদান করেন, তাহ’লে আবু  মেহজান শাহাদত বরণ না করলে সবার আগে আপনার কাছে ফিরে আসবে। অতঃপর যাবরা তার শিকল  খুলে দিয়ে উক্ত ঘোড়াটি ও তরবারীটি দিয়ে দিলেন। তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করে নিমিষেই  সৈন্যদের সাথে মিলিত হ’লেন এবং তাকবীর ধ্বনি দিয়ে শত্রুদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হ’লেন।  অতঃপর যাকেই সামনে পাচ্ছিলেন তাকেই হত্যা করে বীরদর্পে সামনের দিকে এগোতে থাকেন।  এদিকে সা‘দ (রাঃ) আবু মেহজানকে ছাদের উপর থেকে দেখছিলেন, আর অবাক হয়ে ভাবছিলেন যে,  কে এই অশ্বারোহী? যুদ্ধ শেষে আবু মেহজান কয়েদখানায় ফিরে এসে ঘোড়া ও অস্ত্র ফেরত  দিলেন এবং তার পায়ে বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হ’ল। সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) যখন তার  পূর্ণ বিবরণ জানতে পারলেন, তখন তাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, মদ পানের জন্য তোমাকে আর  কখনও বেত্রাঘাত করব না। তখন আবু মেহজান বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আর কখনও মদ পান  করব না।


সালমা (রাঃ)-এর উৎসাহ:

সালমা ছিলেন অন্যতম মুসলিম সেনাপতি মুছান্না ইবনু হারেছা (রাঃ)-এর বিধবা  স্ত্রী। পরে সা‘দ (রাঃ) তাকে বিয়ে করেন। সা‘দ (রাঃ) স্বীয় নিতম্ব ও দু’হাটুতে  প্রচন্ড ব্যথা পাওয়ায় ক্বিদ্দীস ভবনের ছাদের উপর থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। যখন  সালমা দেখলেন যে, মুসলমান সৈন্যগণ আহত হচ্ছেন এবং ঘোড়াগুলো পশ্চাদপসরণ করছে, তখন  বললেন, হায় মুছান্না! আজকে সেই মহাবীর মুছান্না আর নেই। অর্থাৎ মুছান্না থাকলে  মুসলমানদের এ অবস্থা হ’ত না।  এ কথা শুনে সা‘দ  (রাঃ) রেগে গিয়ে তাকে চপেটাঘাত করলেন। কারণ সা‘দ (রাঃ) তো কাপুরুষতার জন্য ছাদে  অবস্থান করছিলেন না! সালমা মূলতঃ তাঁকে উৎসাহিত করতে চেয়েছিলেন। শুধু সালমা নয়,  যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল নারী এভাবে তাদের যোদ্ধাদের উৎসাহিত করছিল এবং আহতদের  সেবা করছিল।


যুদ্ধের তৃতীয় দিন : ‘আ‘মাস’ 

এ দিনের নাম ‘আ‘মাস’  বা কঠিন যুদ্ধ। এ নাম রাখার পিছনে কারণ হ’ল এ দিনটি উভয় দলের জন্য খুবই বিপজ্জনক ছিল। এ  রাতকে বলা হয় ‘হারীর’  তথা মিউমিউ করে কান্না অর্থাৎ আহতদের  চিৎকারের রাত। আ‘মাসের দিন মুসলমানগণ প্রথম যে কাজটি করেন তা হ’ল শহীদদের কাফন-দাফন  সম্পন্ন করা এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। পক্ষান্তরে পারসিক বাহিনীর নিহতরা  দু’কাতারের মধ্যে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়েই থাকল। আল্লাহ এর মাধ্যমে মুসলমানদের সম্মান  ও পারসিকদের অপমান করলেন।


এদিকে কা‘কা‘ ইবনু আমর কৌশল অবলম্বন করলেন এভাবে যে,  তিনি কাউকে কোন কিছু না জানিয়ে তাঁর বাহিনী নিয়ে ময়দানের বাইরে অবস্থান নিলেন।  সকাল হ’লে বেশ ক’টি একশ’ জনের টিম তৈরী করে প্রত্যেক দলকে তাকবীর দিয়ে ময়দানে  প্রবেশ করতে বললেন। একটির পর একটি টিম এভাবে তাকবীর দিয়ে প্রবেশ করতে থাকল। তাদের  তাকবীর শুনে অন্য সৈন্যরাও তাকবীর দিতে লাগল। কা‘কা‘র ভাই আছেম একই পদ্ধতি অবলম্বন  করলেন। হাশেম ইবনু উতবা সিরিয়া থেকে সাহায্য নিয়ে আসলে তিনিও কা‘কা‘র পদ্ধতি  অনুসরণ করে যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করলেন। এতে মুসলিম বাহিনীর মাঝে নতুন সাহায্য  প্রাপ্তির আনন্দ জেগে উঠল এবং তারা নতুনভাবে উৎসাহিত হন।


এ দিনে পারসিক বাহিনী আবার হাতি নিয়ে ময়দানে প্রবেশ করল। তারা মুসলমানদের  অনেক ক্ষতি করে ফেলল। সা‘দ (রাঃ) পারসিক নও মুসলিমদের নিকট হাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ  করার কৌশল জানতে চাইলেন। তারা বলল, এদের পরাস্ত করতে হ’লে তাদের চোখ ও শুঁড়ে আঘাত  হানতে হবে। সা‘দ (রাঃ) নির্দেশনা দিয়ে কা‘কা‘ ও আছেম ইবনু আমরের কাছে লোক পাঠিয়ে  দিয়ে বললেন, তাদের দু’জনকে বল, তারা যেন সাদা হাতির চোখে আঘাত হেনে তাকে পরাস্ত  করে। আর হাম্মাল ও রুবাইবিল-এর কাছে লোক পাঠিয়ে বললেন, তাদের দু’জনকে বল, তারা যেন  আজরাব হাতিকে করতলগত করে। তারা সাদা হাতিকে হত্যা করতে সক্ষম হ’লেন এবং আজরাব  হাতিকে করতলগত করলেন। এ অবস্থায় হাতিদ্বয় শূকরের মত চিৎকার শুরু করল এবং আজরাব  হাতি পিছনে পলায়ন করে আতীক নদীতে ঝাঁপ দিল। এ দৃশ্য দেখে অন্যান্য হাতিগুলো তার  অনুকরণ করে পারসিক বাহিনীর কাতার ভেদ করে আতীক নদী পাড়ি দিল। আর যারা এদের উপরে  ছিল তারা সকলে নিহত হ’ল। অন্য বর্ণনায় আছে, কা‘কা‘ ও আছেম পার্শ্বে আত্মগোপন করে  থাকলেন এবং সুযোগ পেয়ে এক সাথে সাদা হাতির দু’চোখে বর্শা ঢুকিয়ে দিলেন। এতে হাতি  তার মাথা নিচু করে ফেলল। আর তার চালকেরা নিচে পড়ে গেল। সুযোগ মত কা‘কা‘ তার শুঁড়  কেটে ফেললেন এবং চালকদের হত্যা করলেন।


হস্তিবাহিনী পলায়ন করলে মুসলিম সৈন্যরা পারসিক বাহিনীর সাথে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত  হ’ল। তরবারীর মাধ্যমে এ দিন এত কঠিন এবং ভয়াবহ যুদ্ধ হ’ল যে, কাদেসিয়ার অন্য কোন  দিনে এমনটা হয়নি। আ‘মাসের দিনে দু’দল সৈন্যই কঠিন বিপদের মুহূর্তেও সীমাহীন  ধৈর্যের পরিচয় দেয়।


রাত হ’ল কিন্তু যুদ্ধ থামল না। দু’দলের সেনাপতিদের মাঝে  কোন আলোচনাও হ’ল না। মুসলমানগণ এশার ছালাত আদায় করে অস্ত্র নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে  পড়লেন। আহতদের কষ্ট জড়িত শব্দ ব্যতীত অন্য কোন শব্দ শুনা যাচ্ছিল না। এ রাতে  মুসলমানগণ তিন ভাগে ভাগ হয়ে যুদ্ধ করেন।

১. পদাতিক বাহিনী, যারা বর্শা ও তরবারী  নিয়ে যুদ্ধ করছিলেন।

২. তীরন্দায বাহিনী এবং

৩. অশ্বারোহী বাহিনী, যারা পদাতিক  বাহিনীর সামনে থেকে যুদ্ধ করছিলেন।

এ রাতের যুদ্ধ সকাল পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হ’ল। সা‘দ (রাঃ) নিজ সৈন্যদের সংবাদ  জানার আশায় এবং তাদের সার্বিক নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষায় সারা রাত ছালাত ও দো‘আর মধ্যে  অতিবাহিত করলেন।


৪র্থ দিন : বিজয়

সকাল বেলার দিগন্ত বিস্তৃত আলোতে যুদ্ধের ময়দান স্পষ্ট হয়ে গেল। সেনাপতি  সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ)-এর চোখে যুদ্ধের ময়দান ভেসে উঠল। তিনি লক্ষ্য করলেন তারা  সামনে অগ্রসর হয়েছে এবং তারা আনন্দে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তাকবীর ধ্বনি  দিচ্ছেন। তারা আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্তির দৃঢ় প্রত্যাশা করেছিলেন। ফলে এ রাতে  শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করে তাদের দশ হাযার সৈন্যকে হত্যা করতে সক্ষম হন।


কা‘কা‘ ইবনু আমর (রাঃ) বিজয়ের প্রাক্কালে কৌশল অবলম্বন করলেন। তিনি  সৈন্যদের সামনে গিয়ে বললেন, কিছুক্ষণ পর আবার অবস্থার অবনতি হ’তে পারে। অতএব তোমরা  কিছুক্ষণ ধৈর্য ধারণ কর এবং হামলা চালিয়ে যাও। কেননা ধৈর্যের মাধ্যমে সাহায্য লাভ  করা যায়। কা‘কা‘র বক্তব্য শুনে চৌকস সৈন্যদের একটি দল তাঁর পাশে সমবেত হ’ল। তারা  রুস্তমের মূল বাহিনীর দিকে এগিয়ে গেল এবং তার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হ’ল।  যুদ্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হ’ল। হরমুযান ও বীরযান তাদের স্থান হ’তে অপসারিত হ’ল।  মুসলমানগণ কাফিরদের মূল বাহিনীর উপর শাণিত হামলা চালালো। এরই মধ্যে প্রচন্ড ঝড় এসে  রুস্তমের তাঁবুকে নদীতে নিক্ষেপ করল। কা‘কা‘ ও তাঁর সাথীরা রুস্তমের আসনে গিয়ে  আঘাত হানলেন। কিন্তু রুস্তম ঝড়ের সময় স্থান ত্যাগ করায় প্রাণে বেঁচে যান।


এদিকে রুস্তম বোঝা ওয়ালা একটি গাধার পাশে আত্মগোপন করলেন।  হিলাল বিন আলক্বামাহ তামীমী গাধাটির পাশে তাকে লুকিয়ে থাকতে দেখে ছুটে আসলেন তার  দিকে। তাকে হামলা করতে গিয়ে হিলাল গাধার উপর থাকা বোঝা কেটে ফেলে দিলেন। বোঝার নিচে  পড়ে রুস্তমের মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেল। আত্মরক্ষার্থে রুস্তম আতীক নদীতে ঝাঁপ দিলেন।  হেলাল নদীতে গিয়ে তার উপর হামলা করে তার পা ধরে নদীর কিনারায় নিয়ে আসলেন। অতঃপর  তরবারী দিয়ে তার কপালে আঘাত করে তাকে হত্যা করলেন। এরপর হিলাল রুস্তমের সিংহাসনে  আরোহণ করে চিৎকার দিয়ে বলা শুরু করলেন, কা‘বার রবের কসম! আমি রুস্তমকে হত্যা করেছি 


অন্যতম পারসিক সেনাপতি জালিয়ানুস তাদের প্রধান সেনাপতিকে নিহত হ’তে দেখে  সৈন্যদের ময়দান ত্যাগ করে আতীক নদী পার হয়ে মাদায়েনের পথে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ  দিল। কিন্তু তারা নদী পার হ’তে পারল না। মুসলিম সৈন্যরা বর্শা ও তীর দ্বারা তাদের কুপোকাত  করতে লাগল। এভাবে তারা পারসিক বাহিনীর হাযার হাযার সৈন্যকে  নদীতেই হত্যা করল।


সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) যুহরাহ ইবনু হুওয়াই তামীমীর নেতৃত্বে একদল  সৈন্যকে জালিয়ানুসের বিরুদ্ধে পাঠালেন। যুহরা নদী তীরের সন্নিকটে তাকে পেয়ে হত্যা  করলেন।


অবশিষ্ট পারসিক সৈন্যরা পলায়ন করে মাদায়েন থেকে সাহায্যের জন্য আগত  সৈন্যদের সাথে মিলিত হ’ল। ঐ দলের সেনাপতি ছিলেন নুখারেজান। তিনি সকল সৈন্যকে  ঐক্যবদ্ধ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন। নুখারেজান দ্বন্দ্বযুদ্ধের  আহবান জানালে একজন মুসলিম সেনা যুহায়ের ইবনু সুলায়েম বীরদর্পে এগিয়ে গিয়ে নিমেষেই  তাকে হত্যা করেন। এরপর মুসলিম বাহিনী দ্বিতীয় বারের মত পারসিকদের উপর হামলা করল।  এতে তাদের কিছু সৈন্য নিহত হ’ল এবং কিছু পলায়ন করে রাজধানী মাদায়েনে গিয়ে আশ্রয়  নিল।


যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ফলাফল:

চার দিন ও তিন রাত প্রচন্ড যুদ্ধ চলার পর কাদেসিয়া যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।

১. এ যুদ্ধকে যুগান্তকারী যুদ্ধ হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে। এ যুদ্ধের  মাধ্যমে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য সূচিত হয়। মাত্র ছত্রিশ হাযার মুসলিম সৈন্য দুই  লক্ষ সুসজ্জিত পারসিক বাহিনীকে পরাজিত করে।

২. এ যুদ্ধের ফলে অত্র অঞ্চল ইরাকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়  এবং সেখানে ইসলামের প্রচার-প্রসারের সকল বাধা দূরীভূত হয়। যুদ্ধের পর চার হাযার পারসিক  সৈন্য সরাসরি ইসলাম গ্রহণ করে। এছাড়া বিভিন্ন গোত্র ও ইরাকে বসবাসরত ধর্মযাজক দাহকানগণ  দলে দলে সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ)-এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়।

৩. এ যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে পরবর্তীতে পারস্যের রাজধানী মাদায়েন (১৬ হিজরীর  ছফর মাসে) এবং জালাওলা ও হুলওয়ান (১৬ হিজরীর যুলক্বা‘দাহ মাসে) বিজয়ের দার  উন্মুক্ত হয়।

৪. খালিদ ইবনু ওয়ালীদ ও মুছান্না ইবনু হারেছা কর্তৃক বিজিত ইরাকের বিভিন্ন  অঞ্চলের লোকেরা ইতিপূর্বে পারস্য নেতাদের প্ররোচনায় মুসলমানদের সাথে কৃত অঙ্গীকার  ভঙ্গ করেছিল। কিন্তু কাদেসিয়ায় বিজয়ের ফলে তারা নানা ওযর-আপত্তি পেশ করে  মুসলমানদের কাছে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। মুসলমানগণ তাদের ক্ষমা করে দেন। এভাবে পুরো  ইরাকে শান্তি কায়েম হয়।

৫. কাদেসিয়ার যুদ্ধে মুসলমানগণ বহু গণীমত লাভ করে। তন্মধ্যে  উল্লেখযোগ্য হ’ল পারস্যের বড় পতাকা (দারফাশ কাবিয়ান)। এটি তারা নেকড়ে বাঘের চামড়া দিয়ে তৈরী করেছিল। যার  দৈর্ঘ্য বার হাত এবং প্রস্থ আট হাত। যার উপরে মণি-মুক্তা, ইয়াকূত পাথর ও জহরত দিয়ে  নকশা করা ছিল।


উপসংহার:

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শক্তি হ’ল তাদের ঈমানী শক্তি। তারা ঈমানী বলে বলীয়ান  হয়ে যুদ্ধ করে বলেই অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে বিশাল শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ  করে। যুদ্ধ নয় শান্তিই মূলত ইসলামী জিহাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। যুদ্ধ এড়ানোর জন্য  ময়দানে গিয়েও তারা মুশরিকদের বার বার শান্তির প্রস্তাব দিয়েছেন। খায়বারের দিন  রাসূল (ছাঃ) সেনাপতি আলী (রাঃ)-কে বলেছিলেন, ‘হে আলী! তুমি তাদেরকে প্রথমে আল্লাহর  পথে আহবান করবে। কেননা আল্লাহ যদি তোমার মাধ্যমে একজন লোককেও হেদায়াত দান করেন,  তাহ’লে সেটা তোমার জন্য লাল উট প্রাপ্তির চেয়েও উত্তম হবে’। আল্লাহ আমাদের সকলকে শান্তির পথে আহবান করার তাওফীক দান করুন-আমীন!

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন