অভাবী গভর্ণরের অনুপম দানশীলতা পোস্ট নং ১

 


অভাবী গভর্ণরের অনুপম দানশীলতা 

ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব  (রাঃ)-এর খেলাফতকাল ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায়। এ সময় খলীফা ও  জনসাধারণের মাঝে ছিল গভীর সম্পর্ক। খলীফা তাদের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি খুব বেশী  দৃষ্টি রাখতেন। জনসাধারণও তাদের অভাব-অনটন ও দুঃখ-দুর্দশার কথা খলীফাকে বলার সুযোগ  পেত। এমনকি সাধারণ মানুষ খলীফার নিকটে তাদের স্থানীয় আমীরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ  করতেও কোন ভয় পেত না। ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে বিভিন্ন স্থান জয় লাভের ফলে ইসলামী  রাষ্ট্রের পরিধি ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল। বিজয়ী অঞ্চল সমূহে গভর্ণর নির্বাচন করার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সতর্কতা  অবলম্বন করতেন। আল­াহভীরু ও যোগ্যতা  সম্পন্ন লোকদেরকেই গভর্ণর হিসাবে পাঠানো হ’ত। ১৫ হিজরীতে শাম (সিরিয়া অঞ্চল)  বিজয়ের পর খলীফা ওমর (রাঃ) তার দরবারে সাঈদ ইবনু ‘আমের (রাঃ)-কে ডেকে পাঠালেন এবং  তাকে সিরিয়ার ‘হিমছ’ শহরের গভর্ণরের দায়িত্ব প্রদানের প্রস্তাব করলেন। তখন সাঈদ  বিন আমের (রাঃ) বললেন, হে আমীরুল মু‘মিনীন! আপনি এ দায়িত্ব দিয়ে আমাকে ফিতনায়  ফেলবেন না, আমি আপনাকে এ সুযোগ দিতে চাই না যে, আপনি আমার কাঁধে দায়িত্ব চাপিয়ে  দিবেন, অতঃপর আমাকে পরিত্যাগ করবেন। ওমর (রাঃ) বললেন, আমরা তো আপনার জন্য সম্মানী  নির্ধারণ করে দিব না? তিনি বললেন, আল­াহ  তা‘আলা আমার জন্য যে পর্যাপ্ত রিযিক নির্ধারণ করেছেন, তাই তো আমার প্রয়োজনের  অতিরিক্ত। তিনি যখন বাজারে যেতেন অর্ধেক টাকা দিয়ে পরিবারের জন্য বাজার করতেন আর  বাকী অর্ধেকটা দান করে দিতেন। তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন ঋণ পরিশোধ করেছি  (অর্থাৎ দান করার মাধ্যমে জান্নাতের পথ প্রশস্ত করেছি)। লোকেরা এসে তাকে বলত,  আপনার পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনের আপনার প্রতি কিছু অধিকার রয়েছে। তখন তিনি  বলতেন, আমি তো জান্নাতের হুরদের উপর তাদের প্রাধান্য দিতে পারি না।


যাইহোক অবশেষে খলীফা ওমর  ফারূক (রাঃ) সাঈদ ইবনু ‘আমের (রাঃ)-কে ‘হিমছে’র গভর্ণর নিয়োগ করে পাঠালেন। তিনি  দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বায়তুল মালে ‘হিমছ’ থেকে আগত অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে  থাকল। এসময় কেন্দ্র থেকে জনগণের সমস্যার প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি রাখা হ’ত। বিভিন্ন  এলাকা থেকে গরীব-মিসকীন ও অসহায়-দু’স্থদের তালিকা সংগ্রহ করে বায়তুল মাল থেকে  তাদেরকে সাহায্য করা হ’ত। এ তালিকা ওমর ফারূক (রাঃ) নিজেই তদারকি করতেন এবং  উপযুক্ততার বিচারে সাহায্যের পরিমাণ তিনিই নির্ধারণ করতেন।


একবার হিমছবাসীদের একটি  দল মদীনায় আসল। ওমর ফারূক (রাঃ) তাদের মধ্যে কিছু বিশ্বস্ত লোকদেরকে বললেন,  তোমাদের অঞ্চলের অভাবী-দরিদ্র লোকদের একটি তালিকা আমাকে দাও, যাতে তাদেরকে বায়তুল  মাল থেকে সাহায্য করা যায়। ঐ অঞ্চলের অভাবী লোকদের তালিকা ওমর ফারূক (রাঃ)-এর  সামনে পেশ করা হ’লে তিনি গভীরভাবে নামগুলো দেখলেন। হঠাৎ তাঁর সামনে সাঈদ বিন ‘আমের  (রাঃ)-এর নাম ভেসে উঠল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সাঈদ বিন ‘আমের কে? তারা বলল, আমাদের  গভর্ণর। তিনি বললেন, তোমাদের গভর্ণর অভাবী? তারা বলল, আল­াহর কসম! দিনের পর দিন অতিবাহিত হয়ে যায় অথচ তার চুলায় আগুন  জ্বলে না।


খলীফাতুল মুসলিমীন ওমর  ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) কাঁদতে শুরু করলেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। তিনি  ঐ দলকে এক হাযার দীনার দিয়ে বললেন, তোমরা এটা সাঈদ ইবনু ‘আমেরকে দিয়ে বলবে, আমীরুল  মুমিনীন এ উপহার প্রেরণ করেছেন, যাতে আপনি আপনার ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ করতে  পারেন। ‘হিমছ’ পৌঁছে তারা গভর্ণরের সাথে সাক্ষাৎ করে খলীফার পয়গাম ও আমানত  হস্তান্তর করল।


অন্য বর্ণনায় এসেছে, ওমর  (রাঃ) একবার সাঈদ ইবনু ‘আমেরকে বললেন, সিরিয়াবাসী আপনাকে খুব ভালবাসে। তখন তিনি  বললেন, তারা তো ভালবাসবেই। কারণ আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি আবার তাদের বিপদাপদে  সাহায্যও করি। খলীফা ওমর (রাঃ) বললেন, আপনি এই দশ হাযার দীনার গ্রহণ করুন এবং  পরিবারের জন্য খরচ করুন। সাঈদ ইবনু ‘আমের বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আপনি এগুলি আমার  চেয়ে অনেক দরিদ্র মানুষ সমাজে রয়েছে তাদেরকে দান করুন। এ কথা শুনে ওমর (রাঃ)  বললেন, রাসূল (ছাঃ) আমাকে এরূপ কিছু দান করেছিলেন, আমি তোমার মতই জওয়াব প্রদান  করলে তিনি আমাকে বলেছিলেন, যখন আল­াহ  তা‘আলা তোমাকে অন্তরের আসক্তি ও প্রার্থনা ব্যতীতই কোন সম্পদ দান করবেন তখন তুমি  তা গ্রহণ করবে। কেননা সেটা এমন খাদ্য, যা আল­াহ  তোমাকে দান করেছেন (ছহীহুল  জামে‘ হা/২৫৬; কানযুল ঊম্মাল হা/১৬৮১৭)।


তিনি বললেন, আপনি কি এ  হাদীছ রাসূল (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করছেন? ওমর (রাঃ) বললেন, হ্যা। তখন তিনি তা নিয়ে  বাসায় ফিরলেন এবং বার বার বলতে থাকলেন, ‘ইন্না লিল­াহি  ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেঊন’। তাঁর অবস্থা দেখে স্ত্রী হয়রান হয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনার  কি বিপদ হ’ল? এমন হয়নি তো যে, আমীরুল মুমিনীন ইন্তেকাল করেছেন? তিনি বললেন, না।  বরং এর চেয়েও বড় বিপদ। স্ত্রী বলল, মুসলমানরা কি কোথাও পরাজিত হয়েছে? তিনি বললেন,  না। বরং এর চেয়েও বড় বিপদ হয়ে গেছে। সম্পদ আমার পরকাল বিনষ্ট করতে চায়। ঘরে ফেতনা  সৃষ্টিকারী প্রবেশ করেছে। স্ত্রী বলল, তাহ’লে তা থেকে মুক্ত হয়ে যান। ঘরের লোকরা  জানতো না যে, এ সমস্যার সম্পর্ক সম্পদের সাথে। তিনি বললেন, ওহে স্ত্রী! তুমি কি এ  ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবে?। সে বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, এ সম্পদ গুলো  আমীরুল মুমিনীন দিয়েছেন, তুমি চাইলে এগুলো আমরা ব্যবসায় বিনিয়োগ করতঃ তার লভ্যাংশ  পরিবারের জন্য ব্যয় করতে পারি এবং মূলধন জমা রাখতে পারি। আবার তুমি চাইলে এগুলো  জমা রেখে ধীরে ধীরে পরিবারের প্রয়োজন মিটাতে পারি। স্ত্রী বলল, না বরং এগুলো  ব্যবসায় বিনিয়োগ করে তার লভ্যাংশ দিয়ে পরিবার পরিচালনা করুন এবং মূলধন অবশিষ্ট  থাক। অতঃপর সেগুলো একটা বস্তায় রাখা হ’ল। সাঈদ ইবনু ‘আমের প্রতি রাতে একটি  করে ব্যাগ বের করতে থাকলেন এবং গরীব-দুঃখী ও  অভাবীদের মাঝে দান করতে থাকলেন। এভাবে অল্প কিছু বাকী রেখে তিনি মারা গেলেন।


এদিকে ওমর ফারূক (রাঃ)  তার দেওয়া দশ হাযার দীনার সাঈদ (রাঃ) কোন পথে ব্যয় করেছেন। তা জানার জন্য লোক  পাঠালেন। তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হ’লে সে তার দানশীলতার সব ঘটনা খুলে বলল। ফলে  তারা সাঈদকে পেল এমন ব্যক্তি হিসাবে, যে পরকালের জন্য সবকিছু দান করে দিয়েছেন। ওমর  (রাঃ) এ সংবাদ শুনে খুশী হয়ে বললেন, আল­াহ  তার প্রতি দয়া করুন। কতই না সুন্দর তার ধ্যান-ধারণা



বিঃদ্রঃ বাকি লিখা পরের পোস্টে দেয়া আছে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন