এদিকে ওমর ফারূক (রাঃ) তার দেওয়া দশ হাযার দীনার সাঈদ (রাঃ) কোন পথে ব্যয় করেছেন। তা জানার জন্য লোক পাঠালেন। তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হ’লে সে তার দানশীলতার সব ঘটনা খুলে বলল। ফলে তারা সাঈদকে পেল এমন ব্যক্তি হিসাবে, যে পরকালের জন্য সবকিছু দান করে দিয়েছেন। ওমর (রাঃ) এ সংবাদ শুনে খুশী হয়ে বললেন, আলাহ তার প্রতি দয়া করুন। কতই না সুন্দর তার ধ্যান-ধারণা।
একবার ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) ‘হিমছে’ গমন করলেন। ঐ সময়ে তাকে ছোট কুফা বলা হ’ত। কারণ হিমছবাসীরা গভর্ণরের বিরুদ্ধে বেশী বেশী অভিযোগ করত। আর কুফাবাসীদেরকে তো এ ব্যাপারে দৃষ্টান্ত হিসাবে পেশ করা হয়। তিনি এলাকাবাসীকে জিজ্ঞেস করলেন, গভর্ণর সম্পর্কে তোমাদের অভিমত ও অভিযোগ কি? তার উপস্থিতিতে তারা তার বিরুদ্ধে ৪টি অভিযোগ পেশ করল।-
১. রৌদ্র প্রখর হওয়ার পর তিনি মানুষের সাথে সাক্ষাত করেন, এর পূর্বে তার সাথে সাক্ষাত করা বড় কষ্টকর। খলীফা ওমর (রাঃ) সাঈদ বিন ‘আমের (রাঃ)-এর দিকে তাকালেন এবং এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আমি আপনাদেরকে বলতে চাচ্ছিলাম না; কিন্তু বাস্তবতা হ’ল, আমার কোন খাদেম নেই, আমার স্ত্রী অসুস্থ থাকে। তাই আমি নিজে আটা তৈরী করি। এরপর তা খামীর করে রুটি তৈরী করি। ইতিমধ্যে এশরাকের ছালাতের সময় হয়ে যায়। তখন আমি ছালাত আদায় করি। অতঃপর রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড শুরু করি।
ওমর ফারূক (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন তোমাদের দ্বিতীয় অভিযোগ কী? তারা বলল, তিনি রাতে কারো সাথে সাক্ষাত করেন না। ওমর ফারূক (রাঃ) বললেন, সাঈদ এর কারণ কি? তিনি বললেন, আমি তা বলতে চাচ্ছিলাম না। মূলতঃ আমি দিবসের পুরোটাই মানুষের খেদমতের জন্য ওয়াক্ফ করে দিয়েছি। আর রাত্রিকালীন সময় আমার প্রভুর জন্য ওয়াক্ফ করেছি।
খলীফা জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের তৃতীয় অভিযোগ কি? তারা বলল, মাসে একদিন তিনি ঘর থেকে বেরই হন না। উত্তরে সাঈদ বিন ‘আমের (রাঃ) বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আমার কোন খাদেম নেই। আমার পরিধানের মত যে এক জোড়া কাপড় আছে, মাসে একদিন নিজেই তা ধৌত করি এবং তা শুকানোর জন্য বিকাল পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হয়। তাই বের হ’তে আমার সন্ধ্যা হয়ে যায়।
খলীফা ওমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের চতুর্থ অভিযোগ কি? তারা বলল, তিনি মাঝে মধ্যেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। সাঈদ (রাঃ) বললেন, আমি মুশরিক কুরায়েশদের মাঝে ছিলাম। যারা মক্কায় খুবায়েব ইবনু আদী আনছারী (রাঃ)-কে শূলে চড়িয়ে হত্যা করার সময় তার শরীর বর্শার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করছিল আর বলছিল, ‘তুমি কি চাও তোমার স্থানে মুহাম্মাদ (ছাঃ) হোক, আর তুমি স্বীয় কওমের মাঝে নিরাপদে অবস্থান কর?’। খুবায়েব (রাঃ) বললেন, ‘আলাহর কসম! আমি চাই না যে, তাঁর শরীরে সামান্য কাঁটাও বিদ্ধ হোক, আর আমি আমার পরিবার বর্গের মাঝে আনন্দে থাকি’।
যখনই ঐ দৃশ্য আমার মানসপটে ভেসে ওঠে যে, এ অন্যায় কাজে আমি তাদেরকে সহযোগিতা করেছিলাম এবং খুবায়েবকে সাহায্য করা থেকে বিরত ছিলাম, তখনই লজ্জা-শরমে ও ভয়ে আমি সংজ্ঞাহীন হয়ে যাই। আমার মনে হয় এ জন্য আলাহ আমাকে ক্ষমা করবেন না এবং কিয়ামতের ঘোরতর বিপদের দিনে এর জন্য আমাকে পাকড়াও করবেন। আফসোস! আমি যদি ঐ সময় মুসলমান হ’তাম আর খুবায়েব (রাঃ)-কে সাহায্য করতাম! কাফেরদেরকে বাধা দিতাম! অথবা খুবায়েব (রাঃ)-এর সাথে শহীদ হয়ে যেতাম!!
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) যখন এ সমস্ত উত্তর শুনলেন তখন বললেন, সমস্ত প্রশংসা আলাহর জন্য। আমি যাকে নেতৃত্বের জন্য বাছাই করেছি, সে দুর্বল নয়। অতঃপর তিনি তাকে এক হাযার দিনার হাদিয়া দিলেন। যাতে তিনি তার সংসারের প্রয়োজন মিটাতে পারেন। সাঈদ (রাঃ)-এর স্ত্রী তা দেখে বলল, এ দিয়ে আমরা আমাদের চলাচলের জন্য কোন যানবাহন এবং খাদেমের ব্যবস্থা করতে পারব। তখন সাঈদ (রাঃ) স্ত্রীকে বললেন, এর চেয়ে উত্তম জিনিস কেন গ্রহণ করব না। সে বলল, তা কি? তিনি বললেন, এগুলো আলাহর পথে ব্যয় করে তাঁর কাছ থেকে এর প্রতিদান নিব। নেককার স্ত্রী মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে বলল, ভাল কথা। আলাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। অতঃপর তিনি নিজের পরিবারের কোন একজনকে ডেকে বললেন, এ দীনারগুলি নিয়ে গিয়ে অমুক ইয়াতীমকে এত দিবে, অমুক মিসকীনকে এত দিবে, অমুক বিধবাকে এত দিবে, অমুক অভাবীকে এত দিবে। এভাবে পুরো অর্থই ঐ বৈঠকে বিলি করার নির্দেশ দিলেন। আলাহ তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হউন (ইবনু আসাকের, তারীখু দিমাশক ২১/১৬০-১৭০; ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া ১/৬৬৫; আবু নাঈম ইস্পাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ১/২৪৫-২৪৭)।
